দেশবার্তা ডেস্কঃ বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের দাম ঘনমিটার প্রতি ১৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ টাকা এবং যানবাহনে ব্যবহৃত সিএনজি ৪৩ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬৫ টাকার মতো করতে চায় পেট্রোবাংলা। ভর্তুকি থেকে বের হয়ে আসতে প্রতিষ্ঠানটি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে এমন প্রস্তাবনা জমা দিয়েছে বলে জানা গেছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্র জানিয়েছে তারা বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে দেখছেন। বিষয়টি অনুমোদন হলে পেট্রোবাংলায় ফেরত যাবে, এরপর বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) প্রস্তাব প্রেরণ করা হবে। তারপর শুরু হবে আইনগত প্রক্রিয়া।
সর্বশেষ ২০২৫ সালের এপ্রিলে নতুন শিল্পে ৩০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪০ টাকা একই বছরে নভেম্বরে সার উৎপাদনে ১৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৯.২৫ টাকা করা হয়েছে। তবে এ দফায় অন্যান্য গ্রাহকের দাম বাড়ানোর কোন ইচ্ছে এখন পর্যন্ত নেই বলে জানিয়েছে পেট্রোবাংলা।
গ্যাসের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি বিতরণ কোম্পানিগুলো চার্জ (বিতরণ চার্জ) বাড়ানোর আবেদন করেছে। কর্নফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি ঘনমিটার প্রতি বিতরণ চার্জ ৩৭ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১.২১ টাকা, পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড ২৪ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৪১ পয়সা, বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি ৩০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৯০ পয়সা, তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন এন্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসি দুই ধরণের ফর্মুলার প্রস্তাব করেছে। অনুমোদিত সিস্টেম লস ৫ শতাংশ ধরা হলে ২১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৩৫ পয়সা আর ২ শতাংশ হলে ১ টাকা ৪ পয়সা প্রস্তাব করেছে।
জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন এন্ড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম লিমিটেড ১৮ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৬৩ পয়সা করার প্রস্তাব করেছে। খুলনা ও বরিশাল বিভাগে বিতরণের দায়িত্বে থাকা সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড ২৪ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১ টাকা ৫ পয়সা করার প্রস্তাব করেছে। কোম্পানিগুলো দাবি করেছে, বিতরণ মাশুল থেকে তাদের পরিচালন ব্যয় মিটছে না। কিছু কোম্পানি অপরিচালন আয় থেকে ব্রেক ইভেনে রয়েছে। পে-স্কেল চালু হওয়ায় এই খরচ আরও বেড়ে যাবে। ক্রমাগত লোকসান দিতে থাকলে এক সময় আদমজী জুট মিলের মতো দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার শঙ্কা করছেন তারা।
পেট্রোবাংলা সূত্র জানিয়েছে, ইরান যুদ্ধের কারণে এলএনজি আমদানি ব্যয় অস্বাভাবিকহারে বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া গ্যাসের গড় ক্রয়মূল্য দাঁড়িয়েছে ৩১.৬৫ টাকা (প্রতি ঘনমিটার), আর বর্তমানে গড় বিক্রয়মূল্য রয়েছে ২৩.৬৩ টাকা, এতে করে প্রতি ঘনমিটারে ঘাটতি থাকছে ৮.০২ টাকার মতো।
তবে ইরান যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালী সংকট সব হিসাব পাল্টে দিয়েছে। চলতি বছরের প্রথম ৩ মাস (জানুয়ারি-মার্চ) যেখানে গড় ক্রয়মূল্য পড়েছে ২৭.৬৪ টাকা, অন্যদিকে ইরান যুদ্ধ শুরুর পর (এপ্রিল-জুন ২০২৬) গড় ক্রয়মূল্য উঠেছে ৪৫.৭৯ টাকায়। ওই ৩ মাস গড় বিক্রয়মূল্য ২৩.৬৩ টাকায় বিক্রি করায় প্রতি ঘনমিটারে ঘাটতি হয়েছে ২১.৮২ টাকা। এতে করে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পেট্রোবাংলার ঘাটতি হয়েছে প্রায় ১৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। বিপরীতে সরকার ভর্তুকি দিয়েছে ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।
বিদেশ থেকে আমদানির পাশাপাশি বহুজাতিক কোম্পানি ও রাষ্ট্রীয় ৩টি কোম্পানির কাছ থেকে গ্যাস কিনে থাকে পেট্রোবাংলা। সিলেট গ্যাস ফিল্ড কোম্পানির ও বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ড কোম্পানিকে প্রতি ঘনমিটারের দাম দেওয়া হয় ১ টাকা, বাপেক্সকে দেওয়া হয় ৪ টাকা। শেভরন বাংলাদেশকে ১২ টাকা ( প্রতি হাজার ঘনফুট ২.৭৬ ডলার) আর টাল্লোকে দেওয়া হয় প্রায় ১০ টাকা ( প্রতি হাজার ঘনফুট ২.৩১ ডলার) হারে। অন্যদিকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ৭ মাসে কাতার থেকে আমদানি করা এলএনজির দাম পড়েছে ৪৬ টাকা (প্রতি হাজার ঘনফুট ১০.৬৬ ডলার) এবং ওমান থেকে আনা এলএনজির দাম পড়েছে প্রায় ৪৪ টাকা (প্রতি হাজার ঘনফুট ১০.০৯ ডলার)।
এক সময় দেশীয় গ্যাস ফিল্ডগুলো থেকে ২৮০০ মিলিয়ন পর্যন্ত গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে। মজুদ কমে আসায় ১৬৫০ মিলিয়নে নেমে এসেছে। বিদায়ী বছরে ৩০ শতাংশ গ্যাস আমদানি করা হয়েছে, দেশীয় উৎস থেকে যোগান এসেছে প্রায় ৭০ শতাংশ। ২০৩০ সালে দেশীয় গ্যাসের সরবরাহ ৩০ শতাংশে নেমে আসবে, আর আমদানির অনুপাত বেড়ে ৭০ শতাংশ হবে বলে মনে করছে পেট্রোবাংলা।
দেশীয় উৎস থেকে পাওয়া গ্যাসের ঘনমিটার প্রতি গড় মূল্য ৬.০৭ টাকা, আর ৩০ শতাংশ আমদানির পর দাঁড়াচ্ছে ৩১.৬৫ টাকা থেকে ৪৫.৭৯ টাকা। ৩০ শতাংশ আমদানি করতে গিয়েই দাম সামাল দেওয়া কঠিন হচ্ছে অদূর ভবিষ্যতে ৭০ শতাংশ আমদানির পর কি দাঁড়াবে সহজেই অনুমেয়।
বাংলাদেশের গ্যাস সম্পদ নিয়ে নানা রাজনীতি বিদ্যমান। এক সময় বলা হলো গ্যাসের উপর ভাসছে দেশ, আবার আরেক সময় বলা হলো গ্যাস নেই আমদানি করতে হবে। এই রাজনৈতিক খেলার কারণে অনুসন্ধান কার্যক্রম এখনও তিমিরেই বলা চলে। ১৯৯৫ সালের জ্বালানি নীতিমালায় বছরে ৪টি অনুসন্ধান কূপ খনন করার কথা বলা হয়।
কিন্তু কোন সরকারেই সেই লক্ষ্যমাত্রার ধারের কাছেও ঘেঁষতে পারেনি। যে কারণে গ্যাস খাতের অবস্থা অনেকটা বেসামাল বলা চলে। সংকটের কারণে প্রায় সবধরনের গ্যাস সংযোগ বন্ধ বলা যায়। এতে করে থমকে রয়েছে শিল্পায়ন। আবার বিদ্যমান শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ কেন্দ্র ধুকে ধুকে চলছে।





























