দেশবার্তা ঢাকা: বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে ডেঙ্গু। শহর থেকে গ্রাম বিভিন্ন এলাকায় ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে সাধারণ মানুষের। দেশের প্রায় প্রতিটি হাসপাতালে প্রতিদিনই নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছেন। অনেক হাসপাতালে রোগটির পরিপূর্ণ চিকিৎসা হলেও এডিস মশা নিধন ও নিয়ন্ত্রণে নেই পর্যাপ্ত ব্যবস্থা। যদিও প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি সারা দেশে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে ক্রাশ প্রোগ্রাম চালু করেছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে যে ধরনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা; সিটি করপোরেশন, পৌরসভা বা অন্য কোনো সংস্থা তা নিচ্ছে না। এ কারণে ডেঙ্গুর বিস্তার বাড়ার শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
তৃণমূলে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে নিরাশা
‘ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধে জাতীয় নির্দেশিকা’য় বলা হয়, ইউনিয়নের ওয়ার্ড পর্যায় থেকে শুরু করে পৌরসভা, উপজেলা, জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন প্রতি মাসে মশা পরিস্থিতির ওপর প্রতিবেদন পেশ করবে। প্রতিটি পর্যায়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ব্যক্তির সমন্বয়ে এ-সংক্রান্ত কমিটিও আছে। তবে প্রতিবেদন পাঠানো দূরের কথা, এ ধরনের একটি কমিটি আছে শুনে অনেকেরই ‘আকাশ থেকে পড়ার’ দশা!
নির্দেশিকায় বলা আছে, ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্যরা তাঁর ওয়ার্ডের মশার বিস্তার নিয়ে প্রতি মাসে ইউপি চেয়ারম্যানকে জানাবেন। দেশের অন্তত ছয় জনপ্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলেছে সমকাল। তাদের কেউই মশার খোঁজ রাখার বিষয়টিই জানেন না; প্রতিবেদকের মুখেই প্রথম শুনলেন!
চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর আগ্রাসী রূপ
চট্টগ্রামে চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা যান ১৬ জন। এর মধ্যে সেপ্টেম্বরের ১৭ দিনে মারা যান ১১ জন। পক্ষান্তরে চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হন ৩ হাজার ২৭০ জন। সেপ্টেম্বরের ১৭ দিনে আক্রান্ত হন ১ হাজার ২৩৪ জন। অথচ আগস্টের ৩১ দিনে আক্রান্ত হয়েছিল ১ হাজার দুজন। বিভাগে প্রতিদিন গড়ে আক্রান্ত হচ্ছেন প্রায় ৭৩ জন। সঙ্গে বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যাও। বৃহস্পতিবার এক দিনে আক্রান্ত হন ৫০ এবং মারা যান দুজন।
তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো হাসপাতালে শয্যাসংকট। জরুরি মুহূর্তে ডেঙ্গু আক্রান্তদের জন্য মিলছে না সাধারণ শয্যা এবং আইসিইউ। ফলে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের একটি শয্যার জন্য এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ঘুরতে হচ্ছে। শয্যা না পেয়ে চিকিৎসা না মেলার মতো দুঃখজনক ঘটনাও আছে।
চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মুসলিম উদ্দিন সবুজ বলেন, প্রতিদিন ডেঙ্গু রোগী আসছেন। আমরা কিছু শয্যা নির্ধারণ করে রেখেছিলাম। কিন্তু তা মানা সম্ভব হচ্ছে না। শয্যার তুলনায় রোগী বেশি হওয়ায় অতিরিক্ত রোগী ভর্তি করতে হচ্ছে।
রামেকে ১২ দিনে ২৪৫ ডেঙ্গু রোগী ভর্তি, চারজনের মৃত্যু : রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ১২ দিনে হাসপাতালে নতুন করে ২৪৫ ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে চিকিৎসা শেষে ছাড়পত্র পেয়েছেন ২২১ জন। এ সময়ে ডেঙ্গুতে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শেখ শামীম আহমেদ জানান, যারা মৃত্যুবরণ করছেন তাঁদের বেশির ভাগের বয়স ২২-৩৫ বছরের মধ্যে। এ বয়সের তরুণরা জ্বর হলে খুব একটা গুরুত্ব দেন না। পরিস্থিতি জটিল হলে হাসপাতালে আসছেন। ফলে তাঁদের বাঁচানো কঠিন হচ্ছে।
বগুড়ায় এক দিনে শনাক্ত ১৯
বগুড়ায় দিনদিন বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। প্রতিদিনই নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালসহ জেলার সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে নেওয়া হয়েছে বিশেষ প্রস্তুতি। বগুড়া সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ৬২৮ জন। এর মধ্যে ৫৯২ রোগী চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন। এ ছাড়া সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১৯ ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন।
বগুড়া সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার ডা. সাজ্জাদ উল হক বলেন, সাধারণত ডেঙ্গুর ক্লাসিক্যাল ও হেমোরেজিক-এ দুই ধরনের উপসর্গ দেখা যায়। বগুড়ায় এখন পর্যন্ত শনাক্ত রোগীর মধ্যে হেমোরেজিক ডেঙ্গুর ঘটনা পাওয়া যায়নি।
রংপুরে ২৪ ঘণ্টায় ৪৪ জনের ডেঙ্গু
রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় রংপুর বিভাগে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে কেউ মৃত্যুবরণ না করলেও ৪৪ ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে রংপুরে সাত, লালমনিরহাটে ১৪, নীলফামারীতে ১৫ এবং গাইবান্ধায় আটজন। চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত চারজন রোগী মারা গেছেন। এর মধ্যে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একজন, কুড়িগ্রামে দুজন এবং দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একজন মারা গেছেন। রংপুর বিভাগে ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন ১ হাজার ৬২১ জন। এর মধ্যে সুস্থ হয়েছেন ১ হাজার ৪৯৩ জন। বর্তমানে চিকিৎসাধীন ১২৪ জন।
রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের উপপরিচালক ডা. ওয়াজেদ আলী বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেনতামূলক প্রচারণা চলমান।































