দেশবার্তা ঢাকাঃ নৈতিক স্খলনের দায়ে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) গাজী নজরুল ইসলামকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কার করায় তার এমপি পদ থাকবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। যদিও সংবিধান বলছে, সংসদ সদস্য তার নিজ দল থেকে পদত্যাগ করলে কিংবা দলের বিপক্ষে ভোট দিলে তার আসন শূন্য হবে। তবে দল থেকে বহিষ্কার হলে এমপি পদ থাকবে কি না, সে বিষয়ে সংবিধানে স্পষ্ট কিছুই নেই।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে দল থেকে বহিষ্কারের পর গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ থাকবে কি না? আইনজ্ঞদের মতে, সংবিধানে অস্পষ্টতা থাকলেও ভোটাররা সংশ্লিষ্ট দলের মনোনয়নের ভিত্তিতে প্রার্থীকে ভোট দেন। ফলে দল থেকে বহিষ্কারের পর ওই সদস্যের পদে থাকার নৈতিক অধিকার থাকে না।
এক তরুণীর সঙ্গে ‘ব্যক্তিগত’ ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর বুধবার নৈতিক স্খলনের দায়ে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) গাজী নজরুল ইসলামকে বহিষ্কার করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। তাকে বহিষ্কারের বিষয়টি অবিলম্বে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) অবহিত করার সিদ্ধান্তও নেয় দলটি। দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের এক জরুরি বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিকালে রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে এ বৈঠক হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। বৈঠকে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
পরে এ সংক্রান্ত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সম্প্রতি সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়ায় খবর প্রকাশিত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি নিয়ে সাংগঠনিক তদন্ত করা হয়। তদন্তে তার নৈতিক স্খলন প্রমাণিত হওয়ায় তাকে গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।
এতে আরও বলা হয়, গাজী নজরুল ইসলামকে সংগঠন থেকে বহিষ্কারের বিষয়টি অবিলম্বে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সংবিধানে যা আছে:
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে সংসদে আসন শূন্য হওয়ার প্রসঙ্গে বলা হয়েছে। ওই অনুচ্ছেদ বলা হয়েছে, কোনো দল থেকে মনোনীত কেউ নির্বাচিত হওয়ার পর ওই দল থেকে পদত্যাগ বা সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোট দিলে তার আসন শূন্য হবে। দল থেকে বহিষ্কার হলে আসন শূন্য বা সংসদ সদস্য পদ বাতিলের কথা উল্লেখ নেই।
তবে ফৌজদারি মামলায় তিনি যদি এমনভাবে দণ্ডিত হন, যাতে সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ ও প্রাসঙ্গিক আইনের অধীনে তিনি সংসদ সদস্য থাকার অযোগ্য হয়ে পড়েন, তখন বিষয়টি সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি হবে।
সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে কোনো ব্যক্তি সংসদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার এবং সংসদ সদস্য থাকার যোগ্য হবেন না সে বিষয়ে বলা হয়েছে। এর একাংশে উল্লেখ আছে, নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে কমপক্ষে দুই বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে এবং মুক্তিলাভের পাঁচ বছর অতিবাহিত না হলে ওই ব্যক্তি সংসদ সদস্য থাকার যোগ্যতা হারাবেন।
যা বললেন আইনজ্ঞরা:
রাজনৈতিক দল থেকে কোনো সংসদ সদস্যকে বহিষ্কার করা হলে তার সংসদীয় আসন শূন্য হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ভোটাররা সংশ্লিষ্ট দলের মনোনয়নের ভিত্তিতে প্রার্থীকে ভোট দেন। ফলে দল থেকে বহিষ্কারের পর ওই সদস্যের পদে থাকার নৈতিক অধিকার থাকে না।
মনজিল মোরসেদ বলেন, সংবিধানের ৭০ ও ৬৬ অনুচ্ছেদে দল থেকে বহিষ্কৃত হলে সংসদ সদস্য পদ হারানোর বিষয়ে স্পষ্ট কোনো বিধান নেই। তবে জনম্যান্ডেট ও নৈতিকতার দিক থেকে বহিষ্কৃত সদস্যের আসন শূন্য হওয়া উচিত।
তিনি বলেন, একটি দল যে প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়, জনগণ মূলত সেই দলের ওপর আস্থা রেখেই তাকে ভোট দেয়। দল তাকে বহিষ্কার করলে জনগণের সেই ম্যান্ডেটও আর কার্যকর থাকে না। তাই ওই আসন শূন্য হওয়া প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, অতীতে আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীর ক্ষেত্রেও এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। এ বিষয়ে একটি মামলায় আদালত স্পিকারকে বিষয়টি নির্বাচন কমিশনে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আরেক জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির সাংবাদিকদের বলেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে আছে পদত্যাগের কথা। তিনি (গাজী নজরুল ইসলাম) হয়েছেন বহিষ্কার। জামায়াত আজই নির্বাচন কমিশনকে বিষয়টি জানিয়ে দিচ্ছে। কারণ নৈতিক স্খলন। প্রশ্ন হচ্ছে সংসদ সদস্য থাকতে পারবেন কি না? আমার মতে, না।’
আগের নজীর:
২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পটুয়াখালী-৩ আসন থেকে আওয়ামী লীগের সাংসদ নির্বাচিত হন গোলাম মাওলা রনি। পরে আওয়ামী লীগ থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়। তবে গোলাম মাওলা রনির সংসদ সদস্য পদ বহাল ছিল এবং তিনি ২০০৮ থেকে ২০১৪ মেয়াদের স্বাভাবিক সমাপ্তি টানেন।
২০১৪ সালে নিউইয়র্কে বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে আওয়ামী লীগের মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীকে মন্ত্রিসভা ও দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। পদ থাকবে কি না, তা নিয়ে নির্বাচন কমিশন (ইসি) যখন আইনি শুনানির প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক তখনই ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর তিনি সংসদে আবেগঘন বক্তব্য দিয়ে নিজেই পদত্যাগ করেন। ফলে ইসির কোনো আইনি আদেশে নয়, নিজ ইচ্ছায় পদত্যাগের মাধ্যমে তার আসন শূন্য হয়।
অন্যদিকে ২০২১ সালে ফোনকল কেলেঙ্কারির পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে তথ্য প্রতিমন্ত্রীর পদ ছাড়তে হয় ডা. মুরাদ হাসানকে। জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগও তাকে দল থেকে অব্যাহতি দেয়। তিনিও গোলাম মাওলা রনির মতো নিজের পুরো মেয়াদই পার করেন সংসদ সদস্য হিসেবে।





























