দেশবার্তা ঢাকা: পাইপলাইনে সংযুক্ত গ্রাহকের গ্যাসের চাহিদা ৫৩৫৬ মিলিয়ন ঘনফুট, আরও রয়েছে প্রতিশ্রুত গ্রাহক যারা ইতোমধ্যে সংযোগের জন্য জামানত দিয়ে বসে রয়েছেন। অথচ নতুন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীকে জানানো হলো দৈনিক চাহিদা ৩৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট!
প্রকৃত চাহিদাকে এড়িয়ে সমস্যা সমাধান সম্ভব এমনটি কেউই বিশ্বাস করেন না। তবুও পেট্রোবাংলা এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এই কাজটি করে যাচ্ছে। পেট্রোবাংলা কর্তৃক একেক সময় একেক রকম তথ্য প্রদানের অনেক নজির রয়েছে।
২০২৫ সালের ৬ জানুয়ারি নতুন শিল্পে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবে উল্লেখ করে পাইপলাইনে সংযুক্ত গ্রাহকের দৈনিক চাহিদা ৫৩৫৬ মিলিয়ন ঘনফুট। ৬ মাস পর (আগস্টে) সার উৎপাদনে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবের সময় চাহিদা উল্লেখ করা হয় ৫১০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এই হিসাবের বাইরে রয়েছে বড় অংকের প্রতিশ্রুত ও অপেক্ষমাণ গ্রাহক।
এক তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ৩৭৯টি শিল্পের বিপরীতে প্রতিশ্রুত লোডের পরিমাণ রয়েছে ৩৮০ মিলিয়ন ঘনফুট। যারা কোটি কোটি টাকা জামানত দিয়ে জুতার তলা ক্ষয় করছেন। শুধুমাত্র তৌফিক ই ইলাহী চৌধুরী সিন্ডিকেটকে খুশি করতে না পারায় যারা সংযোগ পাননি। সেই প্রতিশ্রুত গ্রাহকের সংখ্যাও সারা দেশে কম নয়। এতে গোড়াতেই গলদ থেকে যাচ্ছে, আর গলদ রেখে সংকট নিরসন করা কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নব নির্বাচিত বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর সামনে যেদিন (১৮ ফেব্রুয়ারি) চাহিদা ৩৮০০ তুলে ধরা হয়, ওই দিনও পেট্রোবাংলার উৎপাদন বিবরণীতে চাহিদা বলা হয়েছে ৪৪০২ মিলিয়ন ঘনফুট। ওই দিনের বিবরণীতে বলা হয়েছে বিদ্যুতে ২৫২৪ মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ দেওয়া হয়েছে ৭৭৯.৯ মিলিয়ন ঘনফুট, সার উৎপাদনে ৩২৯ মিলিয়নের বিপরীতে ১৭৯ মিলিয়ন, অন্যান্য (শিল্প, বাণিজ্য, আবাসিক, সিএনজি ও চা উৎপাদন) খাতে সরবরাহ দেওয়া হয়েছে ১৫৪৯ মিলিয়ন। যদিও অন্যান্য খাতের চাহিদা কখনই আলাদা করে উল্লেখ করা হয় না।
এখানেই রয়েছে শুভঙ্করের ফাঁকি। ওই দিনও দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের স্বল্পচাপ এবং অনেক এলাকায় সংকটের খরব পাওয়া গেছে। অর্থাৎ অন্যান্য খাতে সরবরাহের তুলনায় চাহিদা আরও অনেক বেশি।
এ বিষয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মুহাম্মদ সাইফুল আলমের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, অনেক ব্যবসায়ী বেশি করে অনুমোদন নিয়ে রেখেছেন, যাতে ভবিষ্যতে সম্প্রসারণ করতে সহজ হয়। অনেক সময় বেশি চাইলে কম অনুমোদন দিয়েছে, যে কারণে হয়তো বেশি করে প্রস্তাব করেছে, কোন কোন ক্ষেত্রে বেশিই অনুমোদিত হয়েছে। প্রকৃত চাহিদা ৩৮০০ মিলিয়নেই।
তবে জ্বালানি সচিবের ওই বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন ফ্যালকন টেক্স লিমিটেড, প্যাসিফিক ব্লু জিন্স ওয়্যার লিমিটেডসহ অনেক প্রতিষ্ঠান। তাদের মতো অনেক শিল্প মালিক রয়েছেন যারা কেউ কেউ ৫ থেকে ১০ বছর ধরে ধর্না দিচ্ছেন সংযোগ কার্যকর করার জন্য। অন্তবর্তীকালীন সরকারও যাদের সংযোগ ঠেকাতে রীতিমতো আদেশ জারি করে আটকে রেখেছে।
২০২৫ সালের ১৮ জুন এক অফিস আদেশে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের তৎকালীন অতিরিক্ত সচিব (অপরেশন) ড. রফিকুল আলমের নেতৃত্বে ৫ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে শিল্প ও ক্যাপটিভ গ্রাহকের নতুন সংযোগ ও লোডবৃদ্ধির আবেদন যাচাই-বাছাই করে অনুমোদন দেওয়ার এখতিয়ার দেওয়া হয়। সেই কমিটির নিরপেক্ষতা নিয়ে বিস্তর প্রশ্ন রয়েছে।
চট্টগ্রামের কনফিডেন্স সল্ট লিমিটেডের সব রেডি, কারখানাটির গ্যাস সংযোগ ইতোপুর্বে অনুমোদিত। কোম্পানিটি নিরাপত্তা জামানতও জমা দিয়েছে অনেক আগেই। সেই কোম্পানির গ্যাস সংযোগ চালু করার জন্য আমিনুল নামের এক ব্যক্তি ৫০ লাখ টাকা দাবি করেন। জনৈক আমিনুল তার গ্রহণযোগ্যতা দেখাতে একজন অতিরিক্ত সচিবের সঙ্গে ফোনে কথাও বলিয়ে দেন। টাকা না দেওয়ায় কোম্পানিটির সংযোগ দেওয়া হয়নি। এ রকম অনেক নজীর খুঁজে পাওয়া যাবে প্রত্যেক বিতরণ কোম্পানিতেই।যে কারণে পেট্রোবাংলার ওই চাহিদা যথাযথ নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বার্তা২৪.কমকে বলেছেন, আমরা যদি কোন দিন ৩৮০০ মিলিয়ন সরবরাহ দিয়ে দেখতে পেতাম, আর বাড়তি চাহিদা নেই, তখন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যেতো। এখন যে তথ্য বলা হচ্ছে, এটি সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম, কারণ কয়েকবছর ধরেই গ্যাসের ভয়াবহ সংকট চলছে। ধারাবাহিকভাবে রেশনিং করা হচ্ছে, বিদ্যুতে কোন দিনেই পুরোপুরি দেওয়া যাচ্ছে না, কখনও সিএনজি ফিলিং স্টেশনে, কখনও সার কারখানায় সরবরাহ কমানো হচ্ছে। সবচেয়ে ভালো হয় যদি সব কোম্পানির প্রতিশ্রুত গ্রাহক এবং অপেক্ষমাণ গ্রাহকের তথ্য নেওয়া যায়। গ্যাস সংযোগ বন্ধ রেখে চাহিদা কম দেখানো কোন কাজের কাজ হচ্ছে না। এতে শিল্পায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে অর্থনীতিতে।
চাহিদার হিসাব নিয়ে যখন প্রবল আপত্তি তখন দৈনিক কমবেশি ২৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে। বেশি চিন্তার হচ্ছে বাড়ন্ত রয়েছে চাহিদা, প্রতিনিয়ত কমছে দেশীয় গ্যাস ফিল্ডের উৎপাদন। এক সময় দেশে ২৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট উৎপাদন হলেও এখন ১৭৫০ মিলিয়নে নেমে এসেছে।এর অন্যতম কারণ বিবেচনা করা হয় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে স্থবিরতাকে। অনুসন্ধানের চেয়ে আমদানিতে মনযোগ বেশি ছিল বিগত সরকারের। গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো থাকল দূরের কথা বর্তমান সরবরাহ অব্যাহত রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ মনে করা হচ্ছে। কারণ সহসা আমদানি বাড়ানোর সুযোগ কম, আবার অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করলেও গ্যাস পাওয়া অনেক সময় সাপেক্ষ।































