আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে মুখোমুখি অবস্থানে গেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। টানা কয়েকদিনের পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যেই সোমবার (১৩ জুলাই) দুই দেশই এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে থাকার দাবি করেছে। এতে যুদ্ধের অবসানে কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও আরও চাপে পড়েছে।
সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে বলছে, রোববার (১২ জুলাই) ওমান উপকূলের কাছে হরমুজ প্রণালিতে একটি কনটেইনার জাহাজে ইরানের হামলা এবং পরে ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। আর এই সংঘাত আবারও হরমুজ প্রণালিকে বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে।
যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট বাণিজ্যিক অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন হতো। অথচ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ৬০ দিনের অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতার মাঝপথে পৌঁছানোর আগেই পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ওই সমঝোতার লক্ষ্য ছিল স্থায়ী আলোচনার পথ তৈরি করা।
তবে সমঝোতার মাধ্যমে সংকট সমাধানের বদলে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে একের পর এক হামলার ঘটনা ঘটছে। এতে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ আবারও শুরু হতে পারে বলে আশঙ্কা বাড়ছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এক বিবৃতিতে বলেন, পূর্ণমাত্রার সংঘাতে ফিরে যাওয়া ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, সোমবার তারা ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সরঞ্জাম এবং ছোট নৌযানসহ কয়েক ডজন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে।
সেন্টকম বলেছে, হরমুজ প্রণালি বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌপথ। এর নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে নেই।
তবে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এ দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। আইআরজিসি বলেছে, ‘হরমুজ প্রণালি আমাদের ভূখণ্ডের অংশ। পৃথিবীর অন্য প্রান্ত থেকে আসা উচ্ছৃঙ্খল ও শিশুহত্যাকারী সেনাবাহিনীকে এখানে অবৈধ হস্তক্ষেপ চালিয়ে যেতে দেয়া হবে না।’
এমন অবস্থায় ইরানের পাল্টা হামলার মুখে যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরের ঘাঁটি থাকা বাহরাইনে দুবার ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সতর্কতামূলক সাইরেন বেজে ওঠে। কুয়েত জানিয়েছে, তারা শুত্রুপক্ষের হামলা প্রতিহত করছে। তবে দুই দেশেই ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, সোমবার ভোরে দেশের কয়েকটি এলাকায় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত একজন নিহত হয়েছেন।
এর আগে রোববার ইরানের হামলা বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, জর্ডান ও ওমান পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। ওমানের জলসীমা ইরানের সঙ্গে হরমুজ প্রণালির অংশ। হামলার ঘটনায় ইরানি কূটনীতিককে তলব করে প্রতিবাদ জানিয়েছে ওমান।
একইদিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী জানিয়েছিল, তারা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, গোলাবারুদের গুদাম, যোগাযোগ সরঞ্জামসহ ইরানের প্রায় ১৪০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। গত সপ্তাহের আগের দুই দফার তুলনায় এটি ছিল আরও বড় পরিসরের অভিযান।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এনবিসির ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে বলেন, ‘গত রাতে আমরা তাদের ওপর ভয়াবহ বোমা হামলা চালিয়েছি।’
এর জবাবে ইরান ওই অঞ্চলের যেসব দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, সেসব স্থানে হামলা চালায়। একই সঙ্গে তারা দাবি করে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ একমাত্র তাদের হাতেই থাকবে এবং প্রয়োজনে এই নৌপথ ব্যবহারকারী জাহাজের কাছ থেকে তারা অর্থও আদায় করতে পারে।
আইআরজিসি সোমবার ভোরে জানায়, তারা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নতুন দফার হামলা শুরু করেছে।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেন, একতরফা চুক্তির যুগ শেষ। আমরা আগেই বলেছিলাম, প্রতিশ্রুতি রাখুন, না হলে মূল্য দিতে হবে। বাস্তবতা এখন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
ইরান দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, প্রণালিটি এখনও জাহাজ চলাচলের জন্য খোলা আছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি এই হামলা এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের মধ্যে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ এখন যুদ্ধ ও স্থবির হয়ে পড়া কূটনৈতিক প্রচেষ্টার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উত্তেজনাও ছড়িয়ে পড়ছে ক্রমেই।





























