দেশবার্তা ডেস্ক: চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল-এনসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া বাতিল এবং বন্দর চেয়ারম্যানের অপসারণের দাবিতে শ্রমিক অসন্তোষ চরম আকার ধারণ করেছে। এসব দাবিতে গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বন্দরে শ্রমিক-কর্মচারীদের ছয় দিনের কর্মবিরতিতে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে বিপুল অঙ্কের লোকসান হয়েছে।
সকালে চট্টগ্রাম বন্দর ভবনে নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন আন্দোলনকারী শ্রমিক-কর্মচারীদের নজিরবিহীন বিক্ষোভের মুখে পড়েন। প্রায় ১৫ মিনিট উপদেষ্টাকে বহনকারী গাড়িটি আন্দোলনকারীরা চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে ‘গো ব্যাক’ স্লোগান দিতে থাকেন।
পরে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে উপদেষ্টার আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে আন্দোলনকারীরা আজ শুক্রবার ও আগামীকাল শনিবার ৪৮ ঘণ্টার জন্য তাঁদের অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, এই সময়ের মধ্যে দাবি মানা না হলে রবিবার থেকে পুনরায় কঠোর ও লাগাতার কর্মসূচিতে ফিরে যাবেন তাঁরা। ছয় দিন চট্টগ্রাম বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ থাকায় কনটেইনার হ্যান্ডলিং, পণ্য খালাস ও সরবরাহ পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছিল। কোনো জাহাজ বহির্নোঙর থেকে বন্দরে প্রবেশ করেনি। ফলে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে সৃষ্টি হয় নজিরবিহীন অচলাবস্থা।
বন্দর সূত্র জানায়, অচলাবস্থায় বহির্নোঙরে অন্তত ১৪০ থেকে ১৪২টি জাহাজ আটকে পড়ে। এর মধ্যে ৩৫টি জাহাজে ছিল রমজানকেন্দ্রিক ভোগ্যপণ্য। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এসব পণ্য খালাস করা না গেলে আসন্ন রমজানের বাজারে সরবরাহ সংকট ও বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, এই বন্দর দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের ৭০ শতাংশের বেশি পণ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার। ছয় দিনের অচলাবস্থা রাজস্ব আদায়, রপ্তানি, শিল্পোৎপাদন ও রমজানের বাজার—সবখানেই তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করেছে। সূত্র জানায়, স্বাভাবিক সময়ে বন্দরে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৯ হাজার টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়। ছয় দিনের অচলাবস্থায় প্রায় ৫৪ হাজার টিইইউএস কনটেইনারের জট তৈরি হয়েছে। প্রতিদিন প্রায় ২০০ কোটি টাকা ধরলে ছয় দিনে রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে এক হাজার ২০০ কোটি টাকা।
জাহাজ ডেমারেজ ও আমদানিকারকদের অতিরিক্ত ব্যয় হিসেবে ১৪০টি জাহাজের ক্ষেত্রে দৈনিক ক্ষতি হয়েছে ৯০০ থেকে এক হাজার ৩৫০ কোটি টাকা।
কাঁচামাল আটকে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ১০ শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা। শিল্প ও বণিক সমিতির সাবেক জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু বলেন, সরকারের অদূরদর্শিতা ও অদক্ষতার ফলেই চট্টগ্রাম বন্দরে টানা ছয় দিনের নজিরবিহীন অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়।
চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনীতির হৃদযন্ত্র। এই গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো অদক্ষভাবে পরিচালিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। সামনে পবিত্র রমজান মাস থাকায় ভোগ্যপণ্যবাহী বহু জাহাজ বহির্নোঙরে আটকে রয়েছে, যার প্রভাব রমজানের বাজারে পড়বে এবং পণ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকিন আহমেদ বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের অচলাবস্থা দেশের অর্থনীতির জন্য ভয়াবহ বিপর্যয়ের সংকেত। তাসকিন আহমেদ জানান, নিত্যপণ্যের বাজারে স্থিতিশীলতা রক্ষায় চট্টগ্রাম বন্দরকে জরুরি সেবা খাত ঘোষণা করে বিশেষ নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আনার পাশাপাশি অন্তত দুই সপ্তাহ ২৪ ঘণ্টা, সাত দিন বিরতিহীন পণ্য খালাস কার্যক্রম নিশ্চিত করার আহবান জানান তিনি।






























