আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক তৎপরতা আবারো অঞ্চলটিকে এক অনিশ্চিত সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়েছে। বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনসহ এই অঞ্চলে একাধিক যুদ্ধজাহাজ ও ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসকারী রণতরি মোতায়েনের মাধ্যমে ওয়াশিংটন স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে, ইরান প্রশ্নে তারা আর কেবল কূটনীতির ওপর নির্ভর করতে চায় না।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সামরিক সমাবেশ কেবল শক্তি প্রদর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানের ওপর বড় ধরনের হামলার প্রস্তুতির ইঙ্গিত বহন করছে। প্রশ্ন উঠছে, এই হামলার লক্ষ্য কি ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নাকি এর চেয়েও বড় কিছু?
সামরিক চাপ ও কূটনৈতিক স্থবিরতা
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। সম্ভাব্য কোনো সমঝোতা নিয়ে আলোচনার খবর তেহরান সরাসরি অস্বীকার করেছে। এর মধ্যেই মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ যে শর্তগুলো সামনে এনেছেন, জাতিসংঘের অস্ত্র পরিদর্শক দল ফিরিয়ে আনা, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে নেওয়া এবং ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করা; তা ইরানের জন্য রাজনৈতিকভাবে প্রায় অসম্ভব বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
এই অচলাবস্থার সরাসরি প্রভাব পড়েছে ইরানের অর্থনীতিতে। কূটনৈতিক সমাধানের কোনো ইঙ্গিত না থাকায় দেশটির পুঁজিবাজারে রেকর্ড দরপতন ঘটেছে, যা সাধারণ মানুষের উদ্বেগ আরো বাড়িয়েছে।
লক্ষ্যবস্তু পরমাণু কর্মসূচি নয়?
সামরিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, আশ্চর্যজনকভাবে এবার যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য ইরানের পরমাণু স্থাপনা নয়। বরং লক্ষ্য করা হচ্ছে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও শাসনব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে আঘাত হানা। উদ্দেশ্য হলো, এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করা, যেখানে অর্থনৈতিক চাপ ও নিরাপত্তাহীনতার ফলে ক্ষুব্ধ জনগণ আবার রাজপথে নামতে বাধ্য হবে।
ইরানের ভেতরে এই মুহূর্তে পরিস্থিতি এমনিতেই উত্তপ্ত। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশটিতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে প্রায় ৬০ শতাংশে পৌঁছেছে। জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের অসন্তোষ বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ধারণা, এই অসন্তোষকে যদি সঠিক সময়ে উসকে দেওয়া যায়, তাহলে শাসনব্যবস্থার ভিত নড়বড়ে হয়ে পড়তে পারে।
বিদেশি হস্তক্ষেপে অনীহা
তবে এখানেই যুক্তরাষ্ট্রের হিসাব জটিল হয়ে উঠছে। ইতিহাস বলছে, ইরানের জনগণ সরকারবিরোধী হলেও বিদেশি শক্তির মাধ্যমে ‘শাসন পরিবর্তন’ প্রশ্নে তারা দ্বিধাবিভক্ত। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে বিদেশি হস্তক্ষেপের স্মৃতি এখনো ইরানের রাজনৈতিক চেতনায় গভীরভাবে প্রোথিত।
এই বাস্তবতা তুলে ধরে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব আলী লারিজানি বলেছেন, “যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি হামলার আগেই ইরানের সামাজিক সংহতি ভাঙার চেষ্টা করছে। তার মতে, দেশটিকে ‘জরুরি অবস্থার’ দিকে ঠেলে দেওয়ার কৌশলই এক ধরনের যুদ্ধ।”
আঞ্চলিক সমীকরণ ও সীমিত বিকল্প
এ সংকটে যুক্তরাষ্ট্র একা নয়, তবে আঞ্চলিক সমর্থনও সীমিত। সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি প্রভাবশালী দেশ স্পষ্ট জানিয়েছে, তারা ইরানের ওপর হামলার জন্য নিজেদের আকাশসীমা বা জলসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেবে না। এতে বোঝা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশই সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে চায় না।
তবে ভূমধ্যসাগরে মার্কিন রণতরির উপস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রকে বিকল্প পথ দিচ্ছে। তৃতীয় কোনো দেশের অনুমতি ছাড়াই সেখান থেকে হামলা চালানোর সক্ষমতা থাকায় ওয়াশিংটনের হাতে এখনো কৌশলগত সুবিধা রয়ে গেছে।
ট্রাম্পের দোলাচল ও অভ্যন্তরীণ বিভক্তি
এই পুরো প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থানও দোদুল্যমান। বিক্ষোভ চরমে পৌঁছালেও তিনি দুই সপ্তাহ আগে ইরানে সরাসরি হামলা থেকে সরে আসেন। কারণ, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে ক্ষমতা থেকে সরানোর পরের ধাপ নিয়ে স্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা ছিল না। পাশাপাশি, ইরানের পাল্টা আঘাত থেকে ইসরায়েলকে রক্ষার বিষয়েও পূর্ণাঙ্গ কৌশল নিয়ে ধোঁয়াশা ছিল।
এ নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের ভেতরেই মতভেদ রয়েছে। ৯ কোটির বেশি জনসংখ্যার দেশে বাইরে থেকে চাপ সৃষ্টি করে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন আদৌ সম্ভব কি না, সে প্রশ্নের কোনো একক উত্তর নেই।
ইউরোপের কঠোর অবস্থান
ইরান সংকট ইউরোপকেও নতুন করে অবস্থান নিতে বাধ্য করছে। ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানির ঘোষণা অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রবিষয়ক কাউন্সিলে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে (আইআরজিসি) নিষিদ্ধ সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করার প্রস্তাব তোলা হতে পারে। এটি বাস্তবায়িত হলে ইরানের ওপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ আরো বাড়বে।
সামনে কী?
সব মিলিয়ে ইরান সংকট এখন এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে সামরিক সংঘাত, অর্থনৈতিক চাপ ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি যতই জোরালো হোক না কেন, ইরানের ভেতরের বাস্তবতা ও আঞ্চলিক সমীকরণ এই সংকটকে দ্রুত সমাধানের পথে যেতে দিচ্ছে না।
প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, এই চাপ কি সত্যিই ইরানে সরকার পরিবর্তনের পথ খুলবে নাকি এটি মধ্যপ্রাচ্যকে আরো দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার দিকে ঠেলে দেবে?































