লাইফস্টাইল ডেস্কঃ চীনের বিজ্ঞানীরা স্টেম সেল থেরাপি ব্যবহার করে ইনসুলিন উৎপাদনকারী অগ্ন্যাশয়ের বিটা কোষ পুনর্গঠনে সফল হয়েছেন, যার ফলে শরীর স্বাভাবিকভাবেই রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। প্রাথমিক মানব পরীক্ষায় দেখা গেছে, কিছু রোগী দৈনিক ইনসুলিন ইনজেকশন ছাড়াই স্বাভাবিক গ্লুকোজ মাত্রা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছেন।
প্রচলিত চিকিৎসা যেখানে কেবল উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধ, সেখানে এই পদ্ধতি ডায়াবেটিসের মূল কারণকে লক্ষ্য করে কাজ করে। ফলে আজীবন ব্যবস্থাপনার বদলে দীর্ঘমেয়াদি আরোগ্যের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। টাইপ–১ ও টাইপ–২—উভয় ধরনের ডায়াবেটিসই এই গবেষণার আওতায় এসেছে, যা বিশ্বজুড়ে ৫০ কোটিরও বেশি আক্রান্ত মানুষের জন্য ফলাফলকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
যদিও আরও বৃহৎ পরিসরের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল প্রয়োজন, বিশেষজ্ঞরা এটিকে ডায়াবেটিসের প্রকৃত চিকিৎসার পথে সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক অগ্রগতিগুলোর একটি হিসেবে দেখছেন।
স্টেম সেল কোথা থেকে আসে?
স্টেম সেলের বেশ কয়েকটি উৎস রয়েছে:
ভ্রূণীয় স্টেম সেল (Embryonic stem cells):
এই স্টেম সেলগুলো ৩ থেকে ৫ দিন বয়সী ভ্রূণ থেকে নেওয়া হয়। এই পর্যায়ে ভ্রূণকে ব্লাস্টোসিস্ট (blastocyst) বলা হয় এবং এতে প্রায় ১৫০টি কোষ থাকে।
এগুলো প্লুরিপোটেন্ট (pluripotent) স্টেম সেল, অর্থাৎ এগুলো নিজে নিজে বিভাজিত হয়ে আরও স্টেম সেল তৈরি করতে পারে অথবা শরীরের যেকোনো ধরনের কোষে রূপ নিতে পারে। এই ক্ষমতার কারণে ভ্রূণীয় স্টেম সেল রোগাক্রান্ত টিস্যু ও অঙ্গ পুনর্গঠন বা মেরামতে ব্যবহার করা যেতে পারে।
প্রাপ্তবয়স্ক স্টেম সেল (Adult stem cells): এই স্টেম সেলগুলো প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীরের অধিকাংশ টিস্যুতে অল্প সংখ্যায় পাওয়া যায়, যেমন অস্থিমজ্জা (bone marrow) বা চর্বি (fat)।
ভ্রূণীয় স্টেম সেলের তুলনায় প্রাপ্তবয়স্ক স্টেম সেলের বিভিন্ন ধরনের কোষে পরিণত হওয়ার ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে সীমিত।
ভ্রূণীয় স্টেম সেলের বৈশিষ্ট্য অর্জনকারী পরিবর্তিত প্রাপ্তবয়স্ক কোষ: বিজ্ঞানীরা জিনগত পুনঃপ্রোগ্রামিং (genetic reprogramming) ব্যবহার করে সাধারণ প্রাপ্তবয়স্ক কোষকে স্টেম সেলে রূপান্তর করেছেন। জিনে পরিবর্তন এনে এই কোষগুলোকে ভ্রূণীয় স্টেম সেলের মতো আচরণ করানো যায়। এ ধরনের কোষকে বলা হয় ইনডিউসড প্লুরিপোটেন্ট স্টেম সেল (induced pluripotent stem cells বা iPSCs)।
এই নতুন প্রযুক্তি ভ্রূণীয় স্টেম সেলের বিকল্প হিসেবে ব্যবহারযোগ্য হতে পারে এবং নতুন স্টেম সেলের বিরুদ্ধে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রত্যাখ্যান কমাতে সাহায্য করতে পারে। তবে পরিবর্তিত প্রাপ্তবয়স্ক কোষ মানুষের শরীরে কোনো বিরূপ প্রভাব ফেলবে কি না, তা এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি।
গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণ সংযোজক টিস্যুর কোষকে পুনঃপ্রোগ্রাম করে কার্যকর হৃদ্কোষে রূপান্তর করা সম্ভব হয়েছে। প্রাণীর ওপর করা গবেষণায়, হৃদ্যন্ত্র বিকল হওয়া প্রাণীদের শরীরে নতুন হৃদ্কোষ প্রবেশ করালে তাদের হৃদ্যন্ত্রের কার্যকারিতা ও বেঁচে থাকার সময় বেড়েছে।
পেরিনাটাল স্টেম সেল (Perinatal stem cells): গবেষকেরা অ্যামনিয়োটিক তরল (amniotic fluid) এবং নাভির রক্তে (umbilical cord blood) স্টেম সেলের অস্তিত্ব পেয়েছেন। এই স্টেম সেলগুলো বিশেষায়িত কোষে রূপ নিতে পারে।
অ্যামনিয়োটিক তরল গর্ভাশয়ে ভ্রূণকে ঘিরে রাখে ও সুরক্ষা দেয়। গবেষকেরা গর্ভবতী নারীদের কাছ থেকে পরীক্ষা বা চিকিৎসার উদ্দেশ্যে নেওয়া অ্যামনিয়োটিক তরলের নমুনায় স্টেম সেল শনাক্ত করেছেন। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় অ্যামনিওসেন্টেসিস (amniocentesis)।
হেমাটোপয়েটিক স্টেম সেল ট্রান্সপ্লান্টে, কেমোথেরাপি বা রোগের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কোষগুলোকে স্টেম সেল দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়, অথবা দাতার রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা ব্যবহার করে কিছু ধরনের ক্যান্সার ও রক্তজনিত রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করা হয়। লিউকেমিয়া, লিম্ফোমা, নিউরোব্লাস্টোমা এবং মাল্টিপল মাইলোমা প্রায়ই এভাবে চিকিৎসা করা হয়। এসব ট্রান্সপ্লান্টে প্রাপ্তবয়স্ক (অ্যাডাল্ট) স্টেম সেল বা নাভির রক্ত (আম্বিলিকাল কর্ড ব্লাড) ব্যবহার করা হয়।
গবেষকেরা প্রাপ্তবয়স্ক স্টেম সেল ব্যবহার করে অন্যান্য অবস্থার চিকিৎসার সম্ভাবনাও পরীক্ষা করছেন, যার মধ্যে হৃদ্যন্ত্রের ব্যর্থতার মতো কিছু অবক্ষয়জনিত রোগ অন্তর্ভুক্ত।
মানুষের ক্ষেত্রে ভ্রূণীয় (এমব্রায়োনিক) স্টেম সেল ব্যবহারের সম্ভাব্য সমস্যাগুলো কী?
ভ্রূণীয় স্টেম সেল কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে হলে গবেষকদের নিশ্চিত হতে হয় যে স্টেম সেলগুলো নির্দিষ্ট কাঙ্ক্ষিত কোষের ধরনে রূপান্তরিত (ডিফারেনশিয়েট) হবে।
গবেষকেরা স্টেম সেলকে নির্দিষ্ট কোষে রূপান্তরিত করার উপায় আবিষ্কার করেছেন—যেমন, ভ্রূণীয় স্টেম সেলকে হৃদ্পেশির কোষে পরিণত করা। এ বিষয়ে গবেষণা এখনও চলমান।
ভ্রূণীয় স্টেম সেল অনিয়মিতভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে বা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিভিন্ন ধরনের কোষে বিশেষায়িত হয়ে যেতে পারে। গবেষকেরা কীভাবে ভ্রূণীয় স্টেম সেলের বৃদ্ধি ও বিকাশ নিয়ন্ত্রণ করা যায় তা নিয়ে অধ্যয়ন করছেন।
ভ্রূণীয় স্টেম সেল প্রতিস্থাপনের পর রোগীর শরীরে রোগপ্রতিরোধী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে—যেখানে শরীর স্টেম সেলকে বিদেশি আক্রমণকারী হিসেবে আক্রমণ করে। আবার কখনও স্টেম সেল প্রত্যাশামতো কাজ নাও করতে পারে, যার পরিণতি অজানা হতে পারে। এসব সম্ভাব্য জটিলতা এড়ানোর উপায় নিয়েও গবেষণা চলছে।
থেরাপিউটিক ক্লোনিং কী, এবং এটি কী ধরনের উপকার দিতে পারে?
থেরাপিউটিক ক্লোনিং—যাকে সোমাটিক সেল নিউক্লিয়ার ট্রান্সফারও বলা হয়—নিষিক্ত ডিম্বাণু ব্যবহার না করেই বহুমুখী স্টেম সেল তৈরির একটি পদ্ধতি। এ কৌশলে প্রথমে একটি অনিষিক্ত ডিম্বাণু থেকে নিউক্লিয়াস (কেন্দ্রক) সরিয়ে নেওয়া হয়, যেখানে জিনগত উপাদান থাকে। এরপর দাতার একটি কোষ থেকেও নিউক্লিয়াস অপসারণ করা হয়।
এই দাতার নিউক্লিয়াসটি ডিম্বাণুর ভেতরে প্রবেশ করানো হয়, অপসারিত নিউক্লিয়াসের স্থলে—এ প্রক্রিয়াকে নিউক্লিয়ার ট্রান্সফার বলা হয়। এরপর ডিম্বাণুটি বিভাজিত হতে থাকে এবং অল্প সময়ে একটি ব্লাস্টোসিস্ট গঠন করে। এতে এমন একটি স্টেম সেল লাইনের সৃষ্টি হয় যা জিনগতভাবে দাতার কোষের সঙ্গে অভিন্ন—মূলত একটি ক্লোন।
কিছু গবেষকের মতে, থেরাপিউটিক ক্লোনিং থেকে প্রাপ্ত স্টেম সেল নিষিক্ত ডিম্বাণু থেকে প্রাপ্ত স্টেম সেলের তুলনায় বেশি উপকারী হতে পারে, কারণ ক্লোন করা কোষগুলো দাতার শরীরে প্রতিস্থাপন করলে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার সম্ভাবনা কম। এছাড়া, এটি গবেষকদের কোনো রোগ কীভাবে বিকশিত হয় তা সুনির্দিষ্টভাবে বোঝার সুযোগ দিতে পারে।
মানুষের ক্ষেত্রে থেরাপিউটিক ক্লোনিং কি সফল হয়েছে?
না। অন্যান্য অনেক প্রজাতিতে সাফল্য পাওয়া গেলেও মানুষের ক্ষেত্রে থেরাপিউটিক ক্লোনিং সফলভাবে করা যায়নি।
গবেষকেরা মানুষের ক্ষেত্রে থেরাপিউটিক ক্লোনিংয়ের সম্ভাবনা নিয়ে এখনও গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
প্রাথমিক মানব পরীক্ষায় স্টেম সেল থেরাপির মাধ্যমে ইনসুলিন উৎপাদন পুনরুদ্ধার এবং ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিক করা সম্ভব হয়েছে। তবে ব্যাপক ব্যবহারের আগে নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে আরও বড় পরিসরের গবেষণা প্রয়োজন।
প্রাথমিক মানব পরীক্ষায় স্টেম সেল থেরাপির মাধ্যমে ইনসুলিন উৎপাদন পুনরুদ্ধার এবং ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিক করা সম্ভব হয়েছে। তবে ব্যাপক ব্যবহারের আগে নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে আরও বড় পরিসরের গবেষণা প্রয়োজন।
সূত্র: ইউরোপিয়ান মেডিক্যাল জার্নাল মেডিক্যাল জার্নাল































