আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ মাদুরো অপসারণ থেকে ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেলের তেলচুক্তি—ওয়াশিংটনের ভেনেজুয়েলা নীতি আসলে কী বদলেছে? ভেনেজুয়েলার রাজনীতিতে ২০২৬ সাল যেন একবিংশ শতকের লাতিন আমেরিকার পুরোনো ভূরাজনীতির নতুন সংস্করণ।
৩ জানুয়ারি মার্কিন সামরিক অভিযানে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত ও আটক করার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজন হলে সাময়িকভাবে ভেনেজুয়েলা পরিচালনা করবে এবং দেশটিকে একটি ‘নিরাপদ ও সুষ্ঠু’ গণতান্ত্রিক রূপান্তরের দিকে নিয়ে যাবে।
কিন্তু আট মাসেরও বেশি সময় পর প্রশ্নটি এখন আরও কঠিন: ওয়াশিংটন কি ভেনেজুয়েলায় গণতান্ত্রিক রূপান্তর ঘটাচ্ছে, নাকি একটি নতুন ভূ-অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করছে? কারণ, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে গণতন্ত্রের চেয়ে তেলের হিসাবই যেন বেশি স্পষ্ট। ২৮ আগস্ট ট্রাম্প ঘোষণা করেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার ৬৫ বিলিয়নেরও বেশি ব্যারেল প্রমাণিত তেল মজুদের ওপর সংখ্যাগরিষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করেছে। হোয়াইট হাউস একে বলেছে ‘বিশ্বের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তেলচুক্তি’।
২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত সরকারি বিবরণে বলা হয়েছে, North American Blue Energy Partners বা NABEP নামের একটি বেসরকারি কোম্পানিকে ১৭টি তেলক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি অধিকার দেওয়া হয়েছে এবং এর সঙ্গে যুক্ত ব্যবস্থায় মার্কিন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও পরিচালনাগত অধিকার থাকবে।
এখানেই ভেনেজুয়েলা প্রশ্নটি শুধু লাতিন আমেরিকার কোনো অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট থাকে না। এটি হয়ে ওঠে সামরিক শক্তি, জ্বালানি নিরাপত্তা, কর্পোরেট স্বার্থ, গণতান্ত্রিক বৈধতা এবং একবিংশ শতকের মার্কিন আধিপত্যের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
মাদুরোকে সরানো হলো, কিন্তু কাকে ক্ষমতায় বসানো হলো?
মাদুরোকে সরানোর পর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল—যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ভেনেজুয়েলার গণতান্ত্রিক বিরোধী নেতৃত্বকে ক্ষমতায় বসায়নি। বরং মাদুরোরই সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজকে অন্তর্বর্তী রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে গ্রহণ করে।
এই সিদ্ধান্তের মধ্যেই ওয়াশিংটনের নীতির প্রথম বৈপরীত্যটি স্পষ্ট হয়ে যায়।
যদি লক্ষ্য সত্যিই গণতান্ত্রিক রূপান্তর হয়, তাহলে সবচেয়ে স্বাভাবিক প্রশ্ন ছিল—জনগণের ভোটে পরাজিত বা বিতর্কিত শাসনব্যবস্থাকে সরিয়ে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিত্ব কোথায়?
মার্কিন সমর্থিত অন্তর্বর্তী সরকারের যুক্তি হচ্ছে—আগে রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল করতে হবে, অর্থনীতি পুনর্গঠন করতে হবে, তারপর নির্বাচন। ওয়াশিংটন এখনো বলছে, ভেনেজুয়েলা নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত নয়। রদ্রিগেজও ২ সেপ্টেম্বর বলেছেন, নির্বাচন হবে যখন দেশ ‘প্রস্তুত’ হবে। অথচ তার অন্তর্বর্তী মেয়াদ নিয়ে সাংবিধানিক প্রশ্ন ইতিমধ্যে সামনে এসেছে। অর্থাৎ, গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত হিসেবে স্থিতিশীলতা—নাকি স্থিতিশীলতার নামে গণতন্ত্রের বিলম্ব? এই প্রশ্নই এখন ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
ভূমিকম্পে উন্মোচিত হয়েছে রাষ্ট্রের দুর্বলতা
জুনে ভেনেজুয়েলায় ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের ধীর ও বিশৃঙ্খল প্রতিক্রিয়া নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। বিরোধী নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদো এই পরিস্থিতিকে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগ হিসেবে দেখেন এবং দেশে ফেরার আগ্রহ প্রকাশ করেন। কিন্তু ওয়াশিংটন তাকে সমর্থন করার পরিবর্তে রদ্রিগেজের ওপর আস্থা বজায় রাখে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে: যে রাষ্ট্রকে ওয়াশিংটন স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক করার কথা বলছে, সেই রাষ্ট্র যদি একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো সংকটেও কার্যকরভাবে সাড়া দিতে না পারে, তাহলে শুধু শীর্ষ নেতৃত্ব পরিবর্তন করে রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা কীভাবে পুনর্গঠিত হবে?
ভেনেজুয়েলার সমস্যা আসলে শুধু মাদুরো নন। সমস্যাটি আরও গভীরে—দুর্বল প্রতিষ্ঠান, ক্ষয়প্রাপ্ত অবকাঠামো, রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানির অব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক মেরুকরণ, দুর্নীতি, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সংকট। সুতরাং একজন প্রেসিডেন্টকে সরানো আর একটি রাষ্ট্রকে পুনর্গঠন করা এক জিনিস নয়।
‘৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল’—সংখ্যাটির রাজনৈতিক অর্থ কী?
ভেনেজুয়েলার কাছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেল মজুদের একটি বিশাল অংশ রয়েছে। কিন্তু মাটির নিচে তেল থাকা এবং সেই তেল থেকে অর্থনৈতিক শক্তি তৈরি করা এক নয়।
ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ ঘাটতি, অবকাঠামোগত অবক্ষয় এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় ক্ষতিগ্রস্ত। বর্তমানে উৎপাদন প্রায় ১.২৫ মিলিয়ন ব্যারেল দৈনিক—১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে যেখানে তা প্রায় ৩ মিলিয়ন ব্যারেলে পৌঁছেছিল। তাই ট্রাম্পের চুক্তিকে শুধু ‘তেল দখল’ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা যাবে না। বাস্তবতা হলো—ভেনেজুয়েলার তেল উত্তোলন বাড়াতে বিপুল মূলধন, প্রযুক্তি, বিদ্যুৎ, পাইপলাইন, বন্দর, শোধনাগার এবং রাজনৈতিক নিশ্চয়তা দরকার।
এই কারণে Chevron ৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করে উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে; Eni ও GE Vernova-ও নতুন বিনিয়োগ ও অবকাঠামো উন্নয়নে যুক্ত হচ্ছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই বিনিয়োগের বিনিময়ে ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্ব কতটা অক্ষুণ্ণ থাকবে?
তেলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন মার্কিন ভূরাজনীতি
ট্রাম্প প্রশাসনের দৃষ্টিতে চুক্তিটির অর্থ শুধু জ্বালানি নয়। এর একটি সুস্পষ্ট ভূরাজনৈতিক মাত্রা আছে। হোয়াইট হাউস নিজেই বলছে, নতুন ব্যবস্থা ভেনেজুয়েলার তেলক্ষেত্র থেকে রাশিয়া ও চীনের প্রভাব সরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বাড়াবে এবং ‘Monroe Doctrine’ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবে। অর্থাৎ, ভেনেজুয়েলা এখন ওয়াশিংটনের কাছে তিনটি সম্পদের সমন্বিত ক্ষেত্র— তেল, ভূরাজনৈতিক প্রভাব এবং চীন-রাশিয়াকে প্রতিহত করা।
এখানে পুরোনো স্নায়ুযুদ্ধের লাতিন আমেরিকা আবার যেন নতুন রূপে ফিরে আসে। তবে এবার আদর্শিক সংঘাতের জায়গায় এসেছে জ্বালানি ও ভূ-অর্থনীতি।
চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতা এখন শুধু দক্ষিণ চীন সাগর, তাইওয়ান বা আফ্রিকায় সীমাবদ্ধ নয়। লাতিন আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদও এই প্রতিযোগিতার অংশ।
কিন্তু ‘সবচেয়ে বড় তেলচুক্তি’ কি বাস্তবায়নযোগ্য?
চুক্তির কাগজে ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল বিশাল সংখ্যা হলেও সেই তেল দ্রুত বাজারে আসবে না। ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেলের একটি বড় অংশ অত্যন্ত ভারী ধরনের; তা উত্তোলন, পরিবহন ও পরিশোধনের জন্য বিশেষ প্রযুক্তি ও অবকাঠামো প্রয়োজন।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো বিনিয়োগকারীদের আস্থা। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র রাজনৈতিকভাবে হস্তক্ষেপ করছে, অন্যদিকে ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত। আজ রদ্রিগেজের সরকার যে চুক্তি করছে, আগামী দিনের নির্বাচিত সরকার সেটিকে একইভাবে গ্রহণ করবে—এ নিশ্চয়তা কোথায়?
সাম্প্রতিক বিশ্লেষণও রাজনৈতিক বৈধতা, আইনি ঝুঁকি এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাকে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অতএব, ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল একটি ভূ-অর্থনৈতিক সম্ভাবনা; এটি এখনো বাস্তব উৎপাদন বা নিশ্চিত অর্থনৈতিক লাভ নয়।
সোনার ক্ষেত্রেও একই গল্প
তেল ছাড়াও ভেনেজুয়েলার বিপুল স্বর্ণসম্পদ রয়েছে। কিন্তু তাতেও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের প্রবল আগ্রহ এখনো দেখা যাচ্ছে না। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, কাতারভিত্তিক UCC Holding ভেনেজুয়েলায় স্বর্ণখনি প্রকল্পের জন্য কর্মী নিয়োগের চেষ্টা করছে। কিন্তু একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক খনিশিল্পের বড় অংশ এখনো সতর্ক। এর অর্থ খুব পরিষ্কার: সম্পদ আছে—কিন্তু সম্পদকে বিনিয়োগযোগ্য সম্পদে পরিণত করার জন্য রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন। এটাই ভেনেজুয়েলার মূল সমস্যা।
গণতন্ত্রকে যদি তেলের পরের অধ্যায় করা হয়?
এখানেই ট্রাম্পের নীতির সবচেয়ে বড় নৈতিক ও রাজনৈতিক প্রশ্ন। কারণ, গণতান্ত্রিক রূপান্তর সাধারণত হওয়া উচিত—রাজনৈতিক বৈধতা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, নির্বাচন, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন-এর ভিত্তিতে।
ভেনেজুয়েলায় এখন যেন বিপরীত একটি মডেল তৈরি হচ্ছে—সামরিক হস্তক্ষেপ, অন্তর্বর্তী শাসন, তেল পুনর্গঠন, বিনিয়োগ, পরে নির্বাচন। এই ক্রম সফল হলে যুক্তরাষ্ট্র বলবে—অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা গণতন্ত্রের ভিত্তি তৈরি করেছে। কিন্তু ব্যর্থ হলে ইতিহাস একে অন্যভাবে পড়তে পারে: একটি স্বৈরাচারী সরকারকে সরিয়ে আরেক ধরনের বহিরাগত-নির্ভর সম্পদশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মারিয়া কোরিনা মাচাদোও এখন বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি তেল বিনিয়োগের জন্য শেষ পর্যন্ত একটি ‘গুরুতর, গণতান্ত্রিক সরকার’ প্রয়োজন।
ভেনেজুয়েলার সামনে তিনটি সম্ভাব্য পথ
প্রথমত, গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন। রদ্রিগেজ অন্তর্বর্তী পর্যায় অতিক্রম করে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী প্রক্রিয়া চালু করতে পারেন। বিরোধী দলগুলো অংশ নেবে, প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠিত হবে এবং তেলসম্পদ রাষ্ট্রীয় স্বার্থে ব্যবহারের নতুন কাঠামো তৈরি হবে।
দ্বিতীয়ত, সম্পদনির্ভর অন্তর্বর্তী কর্তৃত্ববাদ। তেল উৎপাদন বাড়বে, বিদেশি বিনিয়োগ আসবে, অর্থনীতি কিছুটা ঘুরে দাঁড়াবে—কিন্তু নির্বাচন পিছিয়ে যাবে এবং ক্ষমতার কেন্দ্র ওয়াশিংটন-সমর্থিত একটি সীমিত রাজনৈতিক জোটের হাতে থাকবে।
তৃতীয়ত, জাতীয়তাবাদী প্রতিক্রিয়া। যদি ভেনেজুয়েলার জনগণের বড় অংশ মনে করে যে মাদুরোকে সরানোর বিনিময়ে দেশের তেলসম্পদ বিদেশি নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে, তাহলে ‘সার্বভৌমত্ব বনাম যুক্তরাষ্ট্র’ নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে। এটি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।
আসলে প্রশ্নটি তেল নয়—রাষ্ট্রের মালিকানা
ভেনেজুয়েলার ঘটনাকে শুধু ‘Trump’s oil grab’ কিংবা ‘American liberation’—এই দুই সরল ভাষায় ব্যাখ্যা করলে ভুল হবে। প্রকৃত প্রশ্ন আরও গভীর: একটি রাষ্ট্রের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর মালিকানা কার? রাষ্ট্রের জনগণের? নির্বাচিত সরকারের? রাষ্ট্রীয় কোম্পানির? আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীর? নাকি যে শক্তি সামরিকভাবে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিতে পারে তার? ভেনেজুয়েলার ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেলের প্রশ্ন তাই শুধু অর্থনীতির প্রশ্ন নয়। এটি সার্বভৌমত্বের রাজনৈতিক অর্থনীতি।
ওয়াশিংটনের জন্যও এটি এক ধরনের পরীক্ষা
ট্রাম্প প্রশাসন যদি সত্যিই ভেনেজুয়েলায় সফল হতে চায়, তাহলে শুধু তেল উৎপাদন বাড়ালেই হবে না। তাদের পাঁচটি বিষয় নিশ্চিত করতে হবে:
এক. গ্রহণযোগ্য ও সময়বদ্ধ নির্বাচনী রোডম্যাপ। দুই. তেলচুক্তির পূর্ণ স্বচ্ছতা ও আইনগত বৈধতা। তিন. ভবিষ্যৎ নির্বাচিত সরকারের চুক্তি পুনর্বিবেচনার অধিকার। চার. তেল আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও সামাজিক পুনর্গঠনে ব্যবহার। পাঁচ. ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে এমনভাবে পুনর্গঠন করা, যাতে দেশটি কোনো বিদেশি শক্তির স্থায়ী রাজনৈতিক নির্ভরশীলতায় পরিণত না হয়।
কারণ তেল দিয়ে রাষ্ট্রের অর্থনীতি পুনর্গঠন করা যায়; কিন্তু তেল দিয়ে বৈধতা কেনা যায় না।
লাতিন আমেরিকার জন্যও বড় শিক্ষা
ভেনেজুয়েলার ঘটনাটি শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার সম্পর্কের বিষয় নয়। এটি লাতিন আমেরিকায় মার্কিন শক্তির নতুন প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিতও দিতে পারে।
একসময় Washington-এর Monroe Doctrine ছিল ভূখণ্ডগত প্রভাবের ভাষা। এখন তার নতুন সংস্করণ হতে পারে—energy security, supply chains, critical minerals এবং strategic investment।
এই অর্থে ভেনেজুয়েলা ভবিষ্যতের একটি মডেল হতে পারে। যদি সফল হয়, যুক্তরাষ্ট্র বলতে পারবে—সামরিক শক্তি দিয়ে রাজনৈতিক পরিবর্তন, তারপর বেসরকারি বিনিয়োগ দিয়ে অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং শেষে নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র—এই মডেল কার্যকর।
কিন্তু যদি নির্বাচন অনির্দিষ্টকাল পিছিয়ে যায়, তেলচুক্তি বিতর্কিত হয় এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বলই থেকে যায়, তাহলে ভেনেজুয়েলা হয়ে উঠবে সম্পূর্ণ বিপরীত একটি উদাহরণ।
পথের শেষ কোথায়
মাদুরোকে সরানো ছিল একটি সামরিক ঘটনা। রদ্রিগেজকে ক্ষমতায় রাখা একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেলের তেলচুক্তি একটি ভূ-অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু ভেনেজুয়েলার জনগণের জন্য আসল প্রশ্ন এখনো গণতন্ত্র। ওয়াশিংটন যদি তেলকে গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত বলে এবং গণতন্ত্রকে তেলের পরবর্তী অধ্যায় বানায়, তাহলে ইতিহাস কঠিন প্রশ্ন তুলবে।
প্রশ্ন হলো: যুক্তরাষ্ট্র কি ভেনেজুয়েলাকে মুক্ত করেছে—নাকি শুধু তার সম্পদ ব্যবস্থাপনার কর্তৃত্ব বদলেছে? এই প্রশ্নের উত্তর ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেলের হিসাব দিয়ে পাওয়া যাবে না। উত্তর নির্ধারণ করবে—ভেনেজুয়েলায় কবে স্বাধীন, বিশ্বাসযোগ্য ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন হবে; কে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে এবং শেষ পর্যন্ত ভেনেজুয়েলার তেল থেকে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে ভেনেজুয়েলার জনগণ, নাকি ক্ষমতার নতুন ভূরাজনৈতিক স্থপতিরা।
এই কারণেই ভেনেজুয়েলার বর্তমান অধ্যায়কে শুধু ‘Trump’s oil deal’ হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এটি আসলে ২১ শতকের Monroe Doctrine-এর নতুন পরীক্ষা—যেখানে বন্দুকের পাশে বসেছে তেলের ব্যারেল, আর গণতন্ত্রের পাশে বসেছে ভূ-অর্থনীতি।































