দেশবার্তা ঢাকা: পুলিশের তদন্ত কার্যক্রম নিয়ে সমাজে নানা প্রশ্ন রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির।
তিনি বলেন, পুলিশ অপরাধ দমনে কাজ করলেও অনেক সময় মানুষের স্বাধীনতা খর্ব করার অভিযোগ ওঠে। দীর্ঘ তদন্ত প্রক্রিয়ায় সঠিক কাজ হলেও ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ পুলিশের সমালোচনা করে। কিন্তু ভালো মানুষ বলবে হয়তো, পুলিশ কী করেছে জানি না। সত্য-মিথ্যা বুঝি না, এগুলা বোঝা দরকার। পুলিশের কিছু বিষয় আছে, যার কারণে সমাজে পুলিশের বিপক্ষেও জনমত গড়ে উঠেছে।
সোমবার (৩০ মার্চ) সন্ধ্যায় বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রহমান হলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানে ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. শাহজাহান হোসেনের লেখা বই ‘বাদীই যখন আসামি’–এর মোড়ক উন্মোচন করা হয়।
‘বাদীই যখন আসামি’ প্রসঙ্গে আইজিপি বলেন, বিষয়টি থেকেই বোঝা যায়, সব জায়গায় নৈতিকতার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। যখন একটি মিথ্যা মামলা করা হয়, তখন অনেক ক্ষেত্রে বাদীই আসামিতে পরিণত হন।
তিনি বলেন, ‘যে যেখানে আছেন, পুলিশকে সহযোগিতা করুন। পুলিশ যেন নৈতিকতার সঙ্গে কাজ করতে পারে, সে বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন তিনি। অন্যথায় মাত্র ২ লাখ ১৫ হাজার পুলিশ সদস্য দিয়ে ১৮ কোটি মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রমে সবাইকে সহযোগিতা করতে হবে। তবে তারা কোনো অন্যায় করলে সেইটা দেখার দায়িত্ব সরকারের। সেগুলা ইনশাআল্লাহ নিশ্চিত হবে। এ ব্যাপারে নিশ্চিত থাকতে পারেন।’
আইজিপি বলেন, ‘দীর্ঘ ১৭ বছর পর বিশ্বাসযোগ্য, গ্রহণযোগ্য একটা নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকার পেয়েছি। তাদের (সরকার) এক নম্বর এজেন্ডা হচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা। কারণ আইন-শৃঙ্খলা যদি ঠিক না থাকে, বিদেশি বিনিয়োগ আসবে না, অর্থনৈতিক উন্নয়ন হবে না। আমাদের ব্যাংক শূন্য, শেয়ার মার্কেট শূন্য, সর্বক্ষেত্রে আমাদের অর্থনৈতিক বিপর্যয়। এই বিপর্যয় থেকে যদি অর্থনৈতিক উন্নয়ন, জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করতে হয়, তাহলে আইন-শৃঙ্খলাই সঠিকভাবে পালন করতে হবে। না হলে কোনো উন্নয়ন হবে না।’
এসময় তিনি আরও বলেন, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া যাবে না। ‘মব কালচার’—কোনো ঘটনা ঘটার আগেই রাস্তা অবরোধ করে দেওয়ার প্রবণতা—কারও জন্যই কল্যাণকর নয়। এতে পুলিশের নয়, বরং সমাজের প্রতিটি মানুষেরই সময় নষ্ট হয়।
তিনি উল্লেখ করেন, রাজধানী ঢাকাতে ট্রাফিক জটের কারণে প্রতি বছর প্রায় ৫০০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়। প্রতিদিন এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া পুলিশের পক্ষে একা সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, ‘সাংবাদিক, শিক্ষার্থী, শিক্ষকসহ সমাজের সব শ্রেণির মানুষকে নৈতিকতার সঙ্গে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। তাহলেই না উন্নয়ন হবে এবং সুখে শান্তিতে বসবাস করতে পারব। দেশকে সহযোগিতা করেন। আপনারা মানবিক পুলিশ চান, পুলিশ যে জনগণের বন্ধু—সেই পুলিশ ইনশাআল্লাহ দিতে সক্ষম হব।’
আইজিপি বলেন, অনেক সময় কোনো ঘটনা ঘটলে সবাই চায় শাস্তি সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর করা হোক, বিচার সম্পন্ন হোক। কিন্তু বিচার একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া, যা সবাই জানে। তবুও অনেক সময় পুলিশকে চাপ দেওয়া হয় এখনই জরুরি ভিত্তিতে করতে হবে। তবে সবকিছুরই একটি নির্ধারিত সময় লাগে।
তিনি নিজের অভিজ্ঞতার উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘শেরাটন হোটেলের সামনে একটি বাস পোড়ানোর মামলায় পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা একজন আসামিকে ধরলে সে স্বীকার করেছিল যে, সে বাস পুড়িয়েছে এবং আদালতে ১৬৪ ধারায় এ কথা পুনরায় নিশ্চিত করে। তবে মামলার উকিল দাবি করেন, আসামি তখন রমনা থানার কাস্টডিতে ছিল। তাহলে বোঝেন, চাকরি কমিশনারেরও থাকে না, আমারও থাকে না, ডিসি ডিবিরও থাকে না।’
তিনি বলেন, ‘‘এই ঘটনায় বহু বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। আমার জীবনের ১৭ বছর এই ঘটনার কারণে হয়রানির মধ্যে কাটিয়েছে। নৈতিকতার বিষয়টি সবারই থাকা উচিত। একজন আসামি আদালতে স্বীকার করছে, ‘আমি বাস পুড়িয়েছি, এই ঘটনা আমার দ্বারা ঘটেছে’, অথচ উকিল দাবি করছেন, ‘না, আসামি তখন রমনা থানার কাস্টডিতে ছিল’। এখন আপনি কী বোঝবেন?’’
‘এই ঘটনায় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার চাকরিই চলে যায়। কিন্তু মূল বিষয় হলো—অসলে সে আরেকটি বাস পুড়িয়েছিল, সেটা কার্জন হলের পাশে, আর এই ঘটনা শেরাটনের মোড়ে ঘটেছিল। গান-পাউডার দিয়ে বিআরটিসি বাসে হামলার সময় ১০ জন নিহত হয়েছিল। এই ধরনের ঘটনা ঘটলে তদন্ত স্বাভাবিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হবে। এজন্য তড়িঘড়ি করে কোনো সিদ্ধান্ত না নেওয়াই ভালো। পুলিশকে যথেষ্ট সময় দিতে হবে, তবে খুব বেশি দেরি করারও দরকার নাই…ওই যে বলে বিচার পাবো না।’
মোড়ক উম্মোচন অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ডিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার অতিরিক্ত আইজিপি মো. সারওয়ার, অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম এন্ড অপস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম, পিবিআই প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মোস্তফা কামালসহ ঊধ্বর্তন পুলিশ কর্মকর্তারা।
এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন নর্দন ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ড. মিজানুর রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান রেজাউল ইসলাম সোহাগ প্রমুখ।































