দেশবার্তা ডেস্ক: দেশে হঠাৎ করেই হাম আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়া ও মৃত্যুর ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে দেশজুড়ে। দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে প্রতিদিনই ভর্তি করা হচ্ছে হাম আক্রান্তদের। ইতোমধ্যে অন্তত ১০টি জেলায় হামের প্রকোপ দেখা দিয়েছে।
মূলত হামের টিকা না দেওয়া, শিশুদের মায়ের বুকের দুধ ঠিকমতো না খাওয়ানো, প্রয়োজনীয় কৃমিনাশক না দেওয়া এবং অপুষ্টির কারণে হামের প্রকোপ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। ৯ থেকে ১৫ মাস বয়সি শিশুরা এই রোগের টিকা পাওয়ার পরেও কেন এই সময়ে আবার রোগটির প্রবণতা বাড়ছে, সেই আলোচনা জোরদার হচ্ছে। যদিও স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী মো. সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, গত আট বছর দেশে অতি সংক্রামক হামের কোনো টিকাই দেওয়া হয়নি।
অন্যদিকে চিকিৎসকরা বলছেন, টিকা দেওয়ার পরেও অনেক শিশু এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে, যা উদ্বেগজনক। কারণ, ব্যাপক ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত এই রোগটি আক্রান্ত শিশুর জীবনকেও ঝুঁকিতে ফেলে দিতে পারে। তবে এবার আক্রান্ত রোগীদের উপসর্গ বিবেচনা করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এবং তাতে তারা সুস্থ হচ্ছেন বলেও জানিয়েছেন তারা।
এদিকে পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রায় ছয়শ কোটি টাকা নতুন করে টিকার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে গতকাল রোববার এক অনুষ্ঠানে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি অভিযোগ করেছেন, গত আট বছর অতি সংক্রামক এই রোগটির টিকা না দেওয়ার কারণেই এখন হামের প্রকোপ আবার দেখা যাচ্ছে।
ওদিকে, স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, তারা আগামী জুলাই-আগস্টে বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে দেশজুড়ে শিশুদের হামের টিকা দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। ‘ইতোমধ্যেই ভ্যাকসিন চলে আসছে। আরও যা যা লাগবে সেটি টিকার জন্য গঠিত বৈশ্বিক জোট গ্যাভিকে অবহিত করা হয়েছে। তারা মে থেকে জুলাইয়ের মধ্যে ২ কোটি সিরিঞ্জ দিবে। সবকিছু একত্রিত হলেই আমরা ক্যাম্পেইন (বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি) শুরু করবো,’ এমনটাই জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক শাহরিয়ার সাজ্জাদ।
ময়মনসিংহ মেডিকেলে ১৩ দিনে ৫ শিশুর মৃত্যু : ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দিন দিন বাড়ছে হাম আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। চলতি মাসে এই রোগে আক্রান্ত ১০৬ জন ভর্তি হয়েছেন; তাদের মধ্যে পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। অত্যন্ত ছোঁয়াচে এই রোগের পরিস্থিতি সামাল দিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নানা উদ্যোগ নিয়েছে। গঠন করা হয়েছে বিশেষ মেডিকেল টিম এবং চালু করা হয়েছে পৃথক চিকিৎসা কর্নার।
হাসপাতাল থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসের মাঝামাঝি থেকে হাম আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। একই সঙ্গে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটতে থাকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ২৪ মার্চ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ হাম রোগীদের চিকিৎসার জন্য তিনটি পৃথক মেডিকেল টিম গঠন করে।
শিশু বিভাগের তিনটি কক্ষকে ‘হাম কর্নার’ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতিটি কক্ষে দশটি করে শয্যা রয়েছে, যেখানে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক জাকিউল ইসলাম বলেন, ‘মার্চের ১৭ থেকে ২৯ তারিখ পর্যন্ত ১৩ দিনে হাসপাতালে হাম আক্রান্ত ১০৬ জন ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে মোট পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে; তারা সবাই শিশু। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছে দুই শিশু।’
চট্টগ্রামেও হামের লক্ষণ নিয়ে ১২ শিশু হাসপাতালে ভর্তি : চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাম ও হামজনিত নিউমোনিয়ার লক্ষণ নিয়ে ১২ শিশু ভর্তি হয়েছে। এসব রোগীকে শিশু ওয়ার্ডের পৃথক একটি কর্নারে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া অধিকাংশ রোগী কক্সবাজার অঞ্চলের বলে জানা গেছে। তাদের বয়স ১৫ মাসের কম।
সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশু ওয়ার্ডের আগের ডেঙ্গু কর্নারটিকে হাম কর্নারে পরিণত করা হয়েছে। নতুন ভর্তি হওয়া রোগীদের সেখানেই রাখা হয়েছে। ভর্তি হওয়া ১২ শিশুর মধ্যে ২ জনের বয়স ৬ মাসের কম, বাকিদের বয়স ৭ থেকে ১৫ মাসের মধ্যে। ওই কর্নারে অন্য কোনো রোগীকে রাখা হচ্ছে না।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ মুছা মিঞা বলেন, সাধারণত হামের লক্ষণ দেখেই প্রাথমিকভাবে রোগ শনাক্ত করে চিকিৎসা দেওয়া হয়। তবে নমুনা পরীক্ষা করলে নিশ্চিত হওয়া যায়। প্রাথমিকভাবে যাদের শনাক্ত করা হয়, তাদের বেশির ভাগের ক্ষেত্রেই পরে হাম ধরা পড়ে। হামের আলাদা ব্যবস্থা না থাকলেও রোগীদের আলাদা স্থানে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
রামেকে মার্চ মাসে ১২ শিশুর মৃত্যু : মার্চ মাসে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের চিকিৎসাধীন অবস্থায় মোট ১২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে আইসিইউয়ে মারা গেছে ৯ জন। অন্যদিকে সাধারণ ওয়ার্ডের কোনো খবর জানা যায়নি।
রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় সূত্র জানায়, অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ হাম রাজশাহী অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় ১৮ মার্চ রাজশাহী বিভাগের ১৫৩ রোগীর নমুনা পরীক্ষা করে ৪৪ জনের হাম পজিটিভ পাওয়া গেছে। আক্রান্তের হার প্রায় ২৯ শতাংশ। তার মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী ও পাবনায় সংক্রমণ বেশি হয়েছে।
১ মার্চ থেকে গত বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) পর্যন্ত রাজশাহীতে ৮৪ জন হামের রোগীকে আইসিইউয়ে নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে আইসিইউয়ে নেয়ার পরও ৯ জন ও আইসিইউর অপেক্ষায় থাকা ৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। পাবনায় শনিবার (২৮ মার্চ) সকাল পর্যন্ত হামে আক্রান্ত ২৬ শিশু ‘হাম ওয়ার্ডে’ চিকিৎসাধীন। চাঁপাইনবাবগঞ্জে গত তিন মাসে চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার (২৭ মার্চ) সকালে হাসপাতালে ভর্তি ছিল ৭০ শিশু।
শুধু ময়মনসিংহ, রাজশাহী বা চট্টগ্রাম নয়, দেশের অন্তত ১০টি জেলায় হাম রোগ উদ্বেগজনকভাবে সংক্রমিত হয়েছে। ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে পাঁচ শিশু এবং একটি বেসরকারি হাসপাতালে এক শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘গত ১৫ দিনে হামের প্রবণতা বেড়েছে। তবে এখনো আমাদের সক্ষমতা রয়েছে। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ডিএনসিসি হাসপাতালে হামের জন্য আলাদা কর্নার করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘কোনো সরকার গত ৮ বছর হামের টিকা দেয়নি। এ কারণে সম্প্রতি হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। তবে এ সংকট সমাধানে ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে নতুন করে টিকা ক্রয় করা হচ্ছে।’
যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা : জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি ঠিকভাবে পরিচালিত না হওয়ায় এ পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল টিকার সংকট দূর না করা এবং বিভিন্ন দাবিতে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের আন্দোলন। চিকিৎসকরা বলছেন, হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে এবং ভাইরাসজনিত উচ্চ সংক্রামক রোগ হওয়ায় হাঁচি-কাশি, কথা বলা বা সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। হামের জটিলতা থেকে ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, চোখ-মাথায় প্রদাহে আক্রান্ত হয় শিশু। এসব শিশুকে হাসপাতালে আলাদা ব্যবস্থাপনায় রেখে চিকিৎসা দিতে হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা, নরসিংদী, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, চট্টগ্রাম, খুলনা, ভোলায় সংক্রমণ বেশি। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের আইসিইউ-প্রধান ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামাল জানিয়েছেন, গত ১০ থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৪৪ শিশু আইসিইউতে ভর্তির সুযোগ না পেয়ে মারা গেছে। হাসপাতাল সূত্র জানায়, এরা হামসহ অন্যান্য রোগে আক্রান্ত ছিল।
হঠাৎ কেন এভাবে হাম বাড়ছে, এমন প্রশ্নে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. কাকলী হালদার বলেন, হাম বাড়ার প্রধান কারণ হলো—টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতি। অনেক শিশু নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি বা ইপিআই থেকে বাদ পড়ে যাওয়ায় তাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়নি। এ ছাড়া ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা এবং অপুষ্টির কারণে ভাইরাসের বিস্তার দ্রুত ঘটে। টিকা না নেওয়া বা অসম্পূর্ণ ডোজ নেওয়ার ফলে একটি বড় জনগোষ্ঠী ঝুঁকির মুখে থাকে, যা প্রাদুর্ভাবের মূল কারণ।
পরিস্থিতি সামাল দিতে কী করা হচ্ছে : স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেছেন, মিজেলসের (হাম) রোগী অনেক বেড়েছে। আট বছর আগে মিজেলসের ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে এবং এরপর ভ্যাকসিন কোনো গভর্নমেন্ট দেয়নি।
‘গত ১৫ দিনে হামের প্রবণতা বেড়েছে। তবে এখনো আমাদের সক্ষমতা রয়েছে। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ডিএনসিসি হাসপাতালে হামের জন্য আলাদা কর্নার করা হয়েছে। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে আইসিইউ রেডি করা হয়েছে, উইথ ভেন্টিলেটর,’ গতকাল ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন তিনি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) আবু হোসেইন মো. মইনুল আহসান বলেছেন, সুনির্দিষ্ট কিছু এলাকায় বেশি আক্রান্ত হলেও কমবেশি সারাদেশেই হামে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পাচ্ছেন তারা। ‘বড় দশটি মেডিকেল কলেজে আলাদা ওয়ার্ড খোলা হয়েছে।
তিনি জানিয়েছেন, সব আইসিইউতে এসব রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া যায় না। তাই আলাদা করে আইসিইউর ব্যবস্থা করা হচ্ছে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে।































