দেশবার্তা ঢাকা: দেশে ভবিষ্যতে আওয়ামী আমলের মতো পরীক্ষার ব্যবস্থা আর থাকবে না বলে মন্তব্য করেছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন। তিনি বলেছেন, নকলমুক্ত ও স্বচ্ছ পরীক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে।
আগের চেয়ে আরও কঠোর হচ্ছে এসএসসি ও এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষা। নকল ও প্রশ্ন ফাঁস রোধে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হবে। নজরদারি বাড়াতে পর্যায়ক্রমে দেশের সব পরীক্ষাকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা বসানো হবে এবং তাৎক্ষণিকভাবে যেকোনো কেন্দ্র পরিদর্শন করা হবে।
পাবলিক পরীক্ষায় নকল ও প্রশ্ন ফাঁস রোধে এসব ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
তিনি বলেন, আপাতত ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা বসানো হবে এবং এসব কেন্দ্র বিশেষভাবে তদারক করা হবে। পর্যায়ক্রমে সব কেন্দ্রে বাধ্যতামূলকভাবে সিসি ক্যামেরা বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রয়োজনে আগের মতো ‘হেলিকপ্টার মিশন’ চালু রাখা হবে, যার মাধ্যমে হঠাৎ করে দেশের যেকোনো কেন্দ্রে পরিদর্শন করা হবে।
বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আগামী ২১ এপ্রিল থেকে শুরু হচ্ছে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা।
২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
সে সময় পাবলিক পরীক্ষায় ব্যাপক নকলের প্রেক্ষাপটে তিনি ‘হেলিকপ্টার মিশন’ চালু করেন।
পরীক্ষার সময় হঠাৎ বিভিন্ন কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে নকল বন্ধে ভূমিকা রাখেন, যার পুরো কৃতিত্বও তিনি পান। প্রায় ১৯ বছর পর আবারও পূর্ণ শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে এবারের পরীক্ষা নিয়ে এক ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
শিক্ষামন্ত্রী জানান, এসএসসি শুরু হওয়ার আগে প্রতিটি শিক্ষা বোর্ডে তিনি নিজে যাবেন এবং বিশেষ নির্দেশনা দেবেন।একই সঙ্গে বোর্ড চেয়ারম্যান বা তাদের প্রতিনিধিদের পরীক্ষার আগে প্রতিটি কেন্দ্র পরিদর্শন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন দিতে হবে। আসন্ন এসএসসি পরীক্ষা থেকেই অতি প্রয়োজনীয় ছাড়া ‘ভেন্যু কেন্দ্র’ রাখা হবে না। পরীক্ষার্থীরা যা লিখবে, তার ভিত্তিতেই নম্বর পাবে এবং কোনো ধরনের অতিরঞ্জিত নম্বর দেওয়া হবে না। চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষা থেকে দেশের সব বোর্ডে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, শিক্ষার্থীদের সময় সাশ্রয়ের জন্য এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা প্রতিবছর ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি ভবিষ্যতে বিষয় সংখ্যা কমানোর প্রয়োজনীয়তা যাচাইয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হবে।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, আসন্ন এসএসসি পরীক্ষা হবে সম্পূর্ণ নকলমুক্ত এবং প্রশ্ন ফাঁসমুক্ত। কোনো কেন্দ্রে অনিয়ম প্রমাণিত হলে শুধু পরীক্ষার্থীর বিরুদ্ধে নয়, দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও বিভাগীয় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এবার থেকে খাতায় কোনো ‘গ্রেস মার্ক’ দেওয়া হবে না। শিক্ষার্থীরা যা লিখবে, তার ভিত্তিতেই নম্বর পাবে। আমরা চাই মেধার প্রকৃত প্রতিযোগিতা হোক এবং অযোগ্যদের পার করে দেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ হোক। আমরা আর কোনো অটোপাস চাই না।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এসএসসি-এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে নকল ও অনিয়ম প্রতিরোধে নজিরবিহীন কঠোর অবস্থান নেওয়া হচ্ছে। পরীক্ষার স্বচ্ছতা বজায় রাখতে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করা হয়েছে। বিশেষ করে দুর্গম এলাকা, চরাঞ্চল, উপকূলীয় অঞ্চল এবং পাহাড়ি এলাকার কেন্দ্রগুলোতে বাড়তি নজরদারি থাকবে। খাতা মূল্যায়নেও কোনো ধরনের দয়া বা অতিরিক্ত নম্বর দেওয়ার সুযোগ রাখা হবে না।
ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের পাশাপাশি লাইভ মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা হবে।
কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে যেকোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতি শনাক্ত হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে সেখানে পৌঁছে যাবেন শিক্ষামন্ত্রী বা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি দল।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের গুজব ও ডিজিটাল জালিয়াতি রোধে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। প্রশ্নপত্র মুদ্রণ ও বিতরণের প্রতিটি ধাপে কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে এবং পুরো প্রক্রিয়া ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের আওতায় আনা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপরও বিশেষ বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, সাধারণ স্কুলগুলোতে নকল তুলনামূলক কম হলেও মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখনো নকলের প্রবণতা বেশি। বিশেষ করে দুর্গম এলাকায় শিক্ষকদের সহযোগিতায় নকলের সুযোগ তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে কেন্দ্রের বাইরে লোক দাঁড়িয়ে ম্যাজিস্ট্রেট বা পরিদর্শক এলে আগাম সংকেত দেওয়া হয়। এ কারণে এবার মাদরাসা কেন্দ্রগুলোতে বিশেষ নজরদারি রাখা হবে এবং গোপন পরিকল্পনার মাধ্যমে নকল প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নকল প্রমাণিত হলে শিক্ষক ও কেন্দ্র সচিবদেরও কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হবে।
এবারের পরীক্ষায় বড় প্রশাসনিক পরিবর্তন হিসেবে ‘ভেন্যু কেন্দ্র’ প্রায় পুরোপুরি বাতিল করা হয়েছে।
শুধু মূল কেন্দ্রগুলোতেই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে, যাতে তদারকি সহজ হয়। ঢাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও বিশেষ নজরদারি থাকবে এবং রাজধানীতে বিশেষ স্কোয়াড গঠন করা হয়েছে, যারা সার্বক্ষণিক টহলে থাকবে।
এ ছাড়া পরীক্ষার দায়িত্বে থাকা শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের ওপরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। কোনো কেন্দ্রে অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং দায়িত্বে অবহেলা করলে চাকরিগত জটিলতার মুখোমুখি হতে হবে।
পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকক্ষ স্থাপন করা হচ্ছে, যেখান থেকে দেশের সব শিক্ষা বোর্ডের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হবে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সন্দেহভাজন চক্রের ওপর নজরদারি বাড়াবে। প্রশ্ন ফাঁসের গুজব ছড়িয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া চক্রের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হবে।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার জানান, এসএসসির প্রশ্নপত্র ইতোমধ্যে জেলা পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশে এ বছর ২৯২টি ভেন্যু কেন্দ্র বাতিল করা হয়েছে। কিশোরগঞ্জের নিকলি ও অষ্টগ্রামে দুটি ভেন্যু কেন্দ্র রাখা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে এবং ৪ ও ৫ এপ্রিল কেন্দ্র সচিবদের সঙ্গে বৈঠকে নকল ও প্রশ্ন ফাঁসমুক্ত পরীক্ষা নিশ্চিত করতে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, যে প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে, সেই প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষক ওই কেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না।
প্রশ্ন ফাঁসের সুযোগ নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিজি প্রেস থেকে প্রশ্নপত্র প্রথমে ফয়েল প্যাকে এবং পরে বিশেষ সিকিউরিটি খামে রাখা হয়েছে, যা একবার খোলা হলে পুনরায় লাগানো যায় না। ট্রেজারি থেকে একজন ট্যাগ অফিসার প্রশ্ন সংগ্রহ করবেন এবং পরীক্ষা শুরুর ১৫ থেকে ২০ মিনিট আগে ট্যাগ অফিসার, পুলিশ কর্মকর্তা ও কেন্দ্র সচিবের উপস্থিতিতে খাম খোলা হবে। ফলে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের কোনো সুযোগ নেই।































