দেশবার্তা ঢাকা: শপথ নিয়েই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে চিন্তাভাবনা করছে সরকার। দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিন এ বিষয়ে কথা বলেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি জানিয়েছেন, যত দ্রুত সম্ভব স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন করা হবে।
এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে এ ঘোষণার পরই নড়ে-চড়ে বসেছে বিএনপির নির্বাচন প্রত্যাশীরা। শুধু তাই নয়, স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছেন তৃণমূলের নেতারা। এ নিয়ে সংঘাতের খবরও পাওয়া যাচ্ছে।
অন্যদিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে লক্ষ্য করে সারা দেশে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন সুবিধাবাদিরাও। বিশেষ করে যারা গত ১৭ বছর ফ্যাসিস্টের ছত্রছায়ায় ছিলেন, ছিলেন না কোনো আন্দোলন-সংগ্রামে, তারাও ভোল পাল্টে মাঠে নেমেছেন। এতে কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন ত্যাগীরা। আবার এ নির্বাচনকে সামনে রেখে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করছেন কেউ কেউ। সব মিলিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগেই এ নিয়ে তৃণমূলের রাজনীতি উত্তপ্ত হয়ে উঠছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন—বিশেষ করে পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে—দেশে বেশ সংঘাতপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হয়। দলীয় কোন্দল গড়ায় হানাহানিতে। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে রক্ত ঝরেছিল। নিজেদের ক্ষমতা সুসংহত করতে তৃণমূলের নেতারা মরিয়া হয়ে ওঠেন। আর তাতেই সহিংসতার সূত্রপাত ঘটে। এমনকি দলীয় নির্দেশনাও এ ক্ষেত্রে কাজ করে না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে সরকারকে দলীয় শৃঙ্খলায় জোর দিতে হবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তৃণমূলের এক বিএনপি নেতা জানান, সম্প্রতি তিনি নিজ দলীয় ক্যাডারদের হামলার শিকার হয়েছেন। কয়েকজন তার বাড়িতে হামলা চালায়। তিনি আরও জানান, গত ১৭ বছর তিনি বিএনপির হয়ে মাঠে রাজনীতি করেছেন। এতে নানাভাবে ফ্যাসিস্ট সরকারের জুলুমের শিকার হয়েছেন। কিন্তু নিজ সরকার যখন ক্ষমতায়, তখনই তাকে হামলার শিকার হতে হচ্ছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে অনানুষ্ঠানিকভাবে তিনি স্থানীয় পর্যায়ে কিছু জনসংযোগ করছিলেন। এরপরই তার ওপর হামলার ঘটনা ঘটে।
এদিকে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন নির্বাচন সামনে রেখে সংগঠনের দিকেও মনোযোগী হচ্ছে বিএনপি। দলটি মনে করছে, সর্বশেষ নির্বাচনে বিএনপি এককভাবে ২০৯ আসনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করেছে। তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ জামায়াতে ইসলামী প্রত্যাশার চেয়ে বেশি আসন পেয়েছে। তা বিএনপিকে বিস্মিত করেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএনপির ঘরোয়া বিবাদের ফসল ঘরে তুলেছে বিরোধী পক্ষ জামায়াত। বিএনপি যেসব জায়গায় হেরেছে, সেগুলোর বেশিরভাগ আসনেই ছিল বিদ্রোহী প্রার্থী। বিএনপি-বিএনপির মধ্যে লড়াইয়ের সুবিধা নেয় জামায়াতের প্রার্থীরা। নির্বাচনের কয়েক মাস আগে থেকে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিজে সম্ভাব্য প্রার্থীদের ডেকে মতবিনিময় করেন।
সূত্র জানায়, বিএনপির হাইকমান্ড সময়-সুযোগ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে তৃণমূলের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন। কী কারণে এমন ফলাফল, তা খোঁজার চেষ্টা করবেন। যেসব জায়গায় সাংগঠনিক দুর্বলতা রয়েছে, তা চিহ্নিত করে দায়িত্বশীল নেতাদের দায়িত্ব দেওয়া হবে। যেখানে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব রয়েছে, মাঠপর্যায়ে নিষ্ক্রিয়তা এবং তৃণমূল কর্মীদের অবমূল্যায়ন করা হয়েছে, সেসব জায়গার কমিটিগুলো ঢেলে সাজানো হবে।
অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের রবিবার (১৮ আগস্ট) পৌরসভার মেয়র, জেলা ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানদের অপসারণ করে। সোমবার (১৯ আগস্ট) উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যানদেরও অপসারণ করা হয়। এরপর বৃহস্পতিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) দেশের ৩২৩টি পৌরসভার কাউন্সিলর এবং ১২টি সিটি করপোরেশনের মেয়র ও ওয়ার্ড কাউন্সিলর একযোগে অপসারণ করা হয়।
এ ১২টি সিটি করপোরেশনের মধ্যে ছিল—ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, রংপুর, গাজীপুর এবং ময়মনসিংহ। বিএনপি সরকার গঠনের পর স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
স্থানীয় সরকার যেমন—জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন; পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন—এসব নির্বাচনে দলের প্রার্থীরা যাতে ভালো ফল করতে পারে, সে জন্য আগেভাগেই মাঠে নামছে বিএনপি। তৃণমূল গুছিয়ে শক্তিশালী সংগঠন নিয়েই স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চায় দলটি। সংসদ নির্বাচনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে স্থানীয় নির্বাচনে ভালো করতে চায় তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি।
এদিকে সরকার পরিচালনায় সফল হতে দল ও সরকারের মধ্যে ভারসাম্য আনতে চাচ্ছে বিএনপি। সে জন্য যারা মন্ত্রিপরিষদের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন, তাদের দলের সাংগঠনিক বড় দায়িত্ব থেকে বিরত রাখা হবে।
যারা মন্ত্রিত্ব পাননি, এমনকি নির্বাচনও করেননি, তাদের দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। তাদের মধ্যে অন্যতম বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যানদের মধ্যে শামসুজ্জামান দুদু, ড. আসাদুজ্জামান রিপন, বরকত উল্লাহ বুলু। চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আব্দুস সালাম, ফরহাদ হালিম ডোনার, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, নাজিম উদ্দিন আলম, ঢাকা-২ আসনের এমপি আমান উল্লাহ আমান, যুগ্ম মহাসচিবদের মধ্যে ভোট থেকে বিরত থাকা হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, নরসিংদী-১ আসনের এমপি খায়রুল কবির খোকন, পরাজিত প্রার্থী সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স প্রমুখ সাংগঠনিক বড় দায়িত্বে আসতে পারেন।































