ক্রীড়া ডেস্ক: চট্টগ্রামে তাপমাত্রা ছিল ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যা অনুভূত হচ্ছিল ৪০ ডিগ্রির মতো। এমন ভয়াবহ গরমে আর লু হাওয়ায় পিচ যেন রীতিমতো পুড়ছিল। ঠিক এমন এক কঠিন দিনেই সাগরিকায় যেন হিমেল হাওয়ার পরশ নিয়ে নাজমুল হোসেন শান্তর ব্যাট থেকে এলো প্রশান্তির এক সেঞ্চুরি।
নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ নির্ধারণী তৃতীয় ম্যাচে ধ্বংসস্তূপের মাঝে দাঁড়িয়ে অবিশ্বাস্য এক সেঞ্চুরি হাঁকান নাজমুল হোসেন শান্ত। দুর্দান্ত ইনিংসে বাংলাদেশের সেকেন্ড ডাউন ব্যাটার করেন ১০৫ রান। টপ অর্ডারের চরম ব্যর্থতায় মাত্র ৩২ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে শুরুতেই দিশাহারা হয়ে পড়েছিল স্বাগতিকরা। এরপরই শুরু হয় এই বাঁহাতি ব্যাটারের ঘুরে দাঁড়ানোর এক রোমাঞ্চকর লড়াই।
এই ক্রিকেটার প্রচণ্ড দাবদাহে ক্লান্তিতে প্রায় নিস্তেজ হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু তার চওড়া ব্যাটে ছিল না কোনো জড়তার ছাপ। গভীর সংকটের মুহূর্তে সতীর্থ লিটন কুমার দাসকে সঙ্গে নিয়ে খাদের কিনারা থেকে দলকে দারুণভাবে টেনে তোলেন তিনি। এই দুই নির্ভরযোগ্য ব্যাটারের কাঁধে চড়েই কিউইদের বিপক্ষে লড়াই করার মতো পুঁজি পায় বাংলাদেশ। শেষ পর্যন্ত সংগ্রহ দাঁড়ায় ৮ উইকেটে ২৬৫ রানে ।
শুরুর চরম বিপর্যয় আর শেষ দিকের ব্যাটারদের নিদারুণ ব্যর্থতার মাঝে এই দু’জনের লড়াকু ইনিংসই মূলত দলের মান বাঁচিয়েছে। ম্যাচের শুরুটা ছিল স্বাগতিকদের জন্য এক চরম দুঃস্বপ্নের মতো। মাত্র ৩২ রান তুলতেই সাজঘরে ফিরে যান টপ অর্ডারের তিন নির্ভরযোগ্য ব্যাটার। দুই ওপেনার সাইফ হাসান ও তানজিদ হাসান ফিরেছেন মাত্র ২ ওভার ১ বলের মধ্যেই। এরপর অভিজ্ঞ ব্যাটার সৌম্য সরকারও বেশিক্ষণ ক্রিজে টিকতে পারেননি।
এমন দায়িত্বহীন ব্যাটিংয়ে দলের অবস্থা যখন শোচনীয়, ঠিক তখনই ত্রাতা হয়ে ওঠেন শান্ত ও লিটন। বীরদর্পে ঘুরে দাঁড়ানোর এক অবিস্মরণীয় গল্প লেখেন এই দুজন। শুরুতে কিছুটা সময় নিয়ে উইকেটের সঙ্গে মানিয়ে নেওার চেষ্টা করেন তারা। কিউই বোলারদের লাইন লেংথ ছিল নিখুঁত। কিন্তু তাদের সেই ধারালো বোলিং সামলে ধীরে ধীরে নিজেদের খোলস ছেড়ে বের হতে থাকেন এই যুগল। দু’জনের এই জুটিতেই মূলত বিশাল ধাক্কা সামলে ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস পায় দল। তারা দুজন চতুর্থ উইকেটে ১৬০ রানের দারুণ এক জুটি গড়েন।
নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে চতুর্থ উইকেটে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রানের জুট এটি। অসাধারণ এক ইনিংস খেলে সেঞ্চুরির খুব কাছে গিয়েও চরম হতাশা নিয়ে মাঠ ছাড়েন লিটন। দীর্ঘ ১৯ ইনিংসের খরা কাটিয়ে পাওয়া ফিফটিকে তিনি কাক্সিক্ষত তিন অঙ্কে রূপ দিতে পারেননি। জেডেন লেনক্সের বলে বোল্ড হওয়ার আগে ৯১ বলে ৭৬ রান করেন তিনি।
সঙ্গী হারালেও শান্ত নিজের লক্ষ্যে ছিলেন অবিচল। ঘরোয়া লীগ ক্রিকেটের দারুণ ফর্ম যেন জাতীয় দলের জার্সিতেও ধরে রাখলেন। প্রচণ্ড গরমে ১৭৭ মিনিট ক্রিজে থেকে নিজের ক্যারিয়ারের চতুর্থ ওয়ানডে সেঞ্চুরি তুলে নেন তিনি। ১১৪ বলে সেঞ্চুরি ছোঁয়ার পর তার পরিচিত বুনো উল্লাস দেখা যায়নি।
চোট আর ক্লান্তিতে হেলমেট খুলে শুধু উড়ন্ত চুমু এঁকে দিয়েছেন ব্যাটে। সবাই ভেবেছিল ‘এবার তিনি থামবেন’, কিন্তু অদম্য এই ব্যাটার হার মানেননি। শেষ পর্যন্ত ১১৯ বলে ৯টি চার ও ২টি ছক্কার মারে ১০৫ রানের বীরত্বপূর্ণ ইনিংস খেলে প্যাভিলিয়নে ফেরেন তিনি। লেনক্সের বলে ছক্কা হাঁকাতে গিয়ে বাউন্ডারির কাছে ধরা পড়েন তিনি। মূলত তার এই অনবদ্য ইনিংসটি চরম বিপদের সময় দলকে একটি শক্ত ভিত গড়ে দিতে অত্যন্ত বড় ভূমিকা রেখেছে।
শান্তর এমন মহাকাব্যিক লড়াইয়ের পরও লেজের ব্যাটারদের চরম ব্যর্থতায় দলের সংগ্রহ প্রত্যাশা অনুযায়ী খুব বড় হয়নি। রিশাদ হোসেন ও তাসকিন আহমেদ না থাকায় এই ম্যাচে বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপের লেজ ছিল বেশ লম্বা। ৭ নম্বর পজিশনের পর স্বীকৃত কোনো ব্যাটারই দলে ছিলেন না। এই দুর্বলতার চড়া মাশুল গুনতে হয়েছে স্বাগতিকদের। শান্ত আউট হওয়ার পর শেষ দিকে রানের চাকা পুরোপুরি থমকে যায়।
শেষ ৭ ওভারে বাংলাদেশ দল সংগ্রহ করেছে মাত্র ৪৪ রান। এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দ্রুত রান তোলার দাবি মেটাতে গিয়ে পুরোপুরি খেই হারিয়ে ফেলেন লোয়ার অর্ডারের ব্যাটাররা। ফলে নির্ধারিত ওভার শেষে দলের সংগ্রহ দাঁড়ায় ৮ উইকেটে ২৬৫ রান।































