দেশবার্তা প্রতিবেদক, ঢাকাঃ মিরপুর ১৪ নম্বর সেকশনের ব্লক ডিতে অবস্থিত বিজয় রাকিন সিটি যেন বর্তমান সময়ের এক বড় আবাসন কেলেঙ্কারির নাম। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে বরাদ্দ করা জমিতে নির্মিত এই প্রকল্পের ৮৭০টি ফ্ল্যাটের মধ্যে ৭৬৬টিই অবৈধভাবে দখল করে নিয়েছেন প্রভাবশালীরা।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) সংবাদ সম্মেলনে মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবারকল্যাণ সমিতির প্রশাসক আবু মো. ইশতিয়াক আজিজ উলফাত অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক ক্ষমতার দাপট আর প্রশাসনিক যোগসাজশে প্রকৃত ভূমিহীন মুক্তিযোদ্ধারা আজ নিজ অধিকার থেকে বঞ্চিত।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ১৯৯৪ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া মিরপুর এলাকায় ১৬ দশমিক ২ একর জমি ভূমিহীন ও অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের আবাসনের জন্য বরাদ্দ দিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল বেকার ও দরিদ্র মুক্তিযোদ্ধাদের একটি স্থায়ী ঠিকানা করে দেওয়া। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই লক্ষ্য ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। সমিতির জমির ওপর মুক্তিযোদ্ধাদের মালিকানা ক্ষুণ্ন করে প্রকল্পটি কার্যত একটি বাণিজ্যিক আবাসন কেন্দ্রে রূপান্তরিত হয়েছে।
ইশতিয়াক আজিজ উলফাত অভিযোগের আঙুল তুলেছেন সাবেক অতিরিক্ত আইজি এ টি আহমেদুল হক চৌধুরীর দিকে। তিনি দাবি করেন, আহমেদুল হক চৌধুরী তার প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে একটি বেসরকারি নির্মাণপ্রতিষ্ঠানের সাথে ৫৭ ৪৩ শতাংশ শেয়ারভিত্তিক চুক্তি সম্পাদন করেন। এই অসম চুক্তির ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের অধিকার খর্ব হয়। পুরো প্রকল্পে নির্মিত প্রায় ১ হাজার ৯৫০টি ফ্ল্যাটের মধ্যে মাত্র ৮৭০টি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য রাখা হলেও, সেখানেও হানা দিয়েছে প্রভাবশালী গোষ্ঠী।
সংবাদ সম্মেলনের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য ছিল সমিতির সদস্য তালিকা। প্রশাসক দাবি করেন, বর্তমানে সমিতির ৫১৬ জন সদস্যের মধ্যে ৩৩৪ জনই প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা নন। এই বিশাল সংখ্যক ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা ও প্রভাবশালী গোষ্ঠী মিলে অধিকাংশ ফ্ল্যাট নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছেন। ফলে যে ভূমিহীন মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য এই প্রকল্প ছিল, তারা আজ রাজপথে ঘুরছেন। উলফাত বলেন, সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও উচ্চপদস্থ আমলাসহ অন্তত ১২৯ জন ব্যক্তি এই প্রকল্পে অবৈধভাবে ২১৪টি ফ্ল্যাট বরাদ্দ নিয়েছেন। এটি কেবল অনিয়ম নয়, এটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর কুঠারাঘাত। এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ মুক্তিযোদ্ধাদের একটি অংশ ইতিমধ্যে হাইকোর্টে মামলা দায়ের করেছেন। এমনকি প্রকল্পের নাম থেকে বিজয় শব্দ ও মুক্তিযুদ্ধের প্রতীকগুলো মুছে ফেলার অপচেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ করা হয়।
দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সমিতির কার্যক্রম স্বচ্ছ করার চেষ্টা করছেন বলে জানান ইশতিয়াক আজিজ উলফাত। তিনি যখনই একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন এবং অমুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন, তখনই তাকে বিভিন্ন মহল থেকে বাধা দেওয়া হচ্ছে। এমনকি তাকে হয়রানিমূলক মামলার হুমকি দিয়ে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। বিজয় রাকিন সিটি প্রকল্পের স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে সংবাদ সম্মেলন থেকে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানানো হয়। প্রকল্পের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত হওয়া সব বরাদ্দ ও চুক্তির উচ্চপর্যায়ের তদন্ত করতে হবে। অমুক্তিযোদ্ধা এবং প্রভাবশালীদের নামে করা সব অবৈধ বরাদ্দ অবিলম্বে বাতিল করে সমিতির সদস্যদের মধ্য থেকে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা নতুন করে যাচাই করতে হবে। যারা জালিয়াতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে ফ্ল্যাট লুট করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
যে মুক্তিযোদ্ধারা জীবনের মায়া ত্যাগ করে দেশ স্বাধীন করেছিলেন, শেষ বয়সে এসে তাদের জন্য বরাদ্দ করা আবাসস্থল নিয়ে এমন নোংরা রাজনীতি ও লুটতরাজ জাতির জন্য লজ্জাজনক। বিজয় রাকিন সিটি প্রকল্পের এই ভয়াবহ চিত্র প্রমাণ করে যে, প্রভাবশালীরা কীভাবে রাষ্ট্রের সম্পদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের অধিকার গ্রাস করেছে। এখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রত্যাশা দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে এই আবাসন জালিয়াতির অবসান ঘটিয়ে প্রকৃত ভূমিহীনদের হাতে ফ্ল্যাটের চাবি বুঝিয়ে দেওয়া হোক।































