দেশবার্তা ডেস্কঃ রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের শিকার রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে এখন ভাঙা একটি কক্ষেই চলছে শিশুদের টিকাদানসহ সীমিত আকারে স্বাস্থ্যসেবা। কেন্দ্রটির স্বাভাবিক কার্যক্রম এখনো ফেরেনি। এর মধ্যে লুটপাটে নষ্ট হয়ে গেছে শিশুদের টিকাদানের রেকর্ড রাখা খাতাও। ফলে কোনো শিশু আগে কোন টিকা, কবে ও কত ডোজ পেয়েছে তা নিশ্চিত হতে এখন অভিভাবকদের দেওয়া তথ্যের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে স্বাস্থ্যকর্মীদের।
স্বাস্থ্যকর্মীরা জানান, আগের টিকার তথ্য অভিভাবকের মনে না থাকলে পরবর্তী ডোজ দেওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে। এতে টিকাদানের ধারাবাহিকতা ঠিক রাখা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে হামলার পর শনিবার ও রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) সড়কের পাশে ত্রিপল টানিয়ে টিকাদান কার্যক্রম চালানো হয়। সোমবার কেন্দ্রের ক্ষতিগ্রস্ত একটি কক্ষ পরিষ্কার করে সেখানে সেবা শুরু করা হয়। বুধবার একই কক্ষে শিশুদের টিকা দেওয়া হচ্ছে।
কেন্দ্রটির নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার বলেন, “একটি কক্ষ পরিষ্কার করে স্বাস্থ্যসেবা চালু করা হয়েছে। স্বাভাবিক পরিবেশে সেবা দেওয়ার মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি।”
সরেজমিনে দেখা যায়, ভাঙা কক্ষটিতে চেয়ার-টেবিল বসিয়ে স্বাস্থ্যকর্মীরা কাজ করছেন। শিশু ও মায়েদের বসার জন্য কয়েকটি চেয়ার রাখা হয়েছে। কেন্দ্রের অন্য অংশে ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ চলায় আশপাশে ধুলাবালি উড়ছে। হামলার পর কয়েক দিন বিদ্যুৎ না থাকলেও মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সংযোগ ফিরে আসে। তবে, পর্যাপ্ত ফ্যানের ব্যবস্থা না থাকায় গরমে শিশু ও মায়েদের ভোগান্তি হচ্ছে। কেন্দ্রের পানি ও শৌচাগারের ব্যবস্থাও স্বাভাবিক হয়নি।
কেন্দ্রটির নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার বলেন, “একটি কক্ষ পরিষ্কার করে স্বাস্থ্যসেবা চালু করা হয়েছে। স্বাভাবিক পরিবেশে সেবা দেওয়ার মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি।”
শিশুদের টিকা দেওয়ার তথ্য সংরক্ষণ করছেন রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের স্বাস্থ্যকর্মীরা
তিনি বলেন, “পানি, বিদ্যুৎ ও শৌচাগারের ব্যবস্থা না থাকায় স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশাপাশি সেবা নিতে আসা মা ও শিশুদেরও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। কেন্দ্রের স্বাস্থ্যকর্মীদের বেশির ভাগই নারী হওয়ায় তাদের কাজের পরিবেশ নিয়েও অসুবিধা হচ্ছে।”
হারিয়েছে টিকার হিসাব
কেন্দ্রটির নার্স মোনতাহা বলেন, “শিশুদের টিকাদানের তথ্য সংরক্ষণের খাতাগুলো হামলা ও লুটপাটের ঘটনায় নষ্ট হয়ে গেছে। এখন নতুন করে টিকা নিতে আসা শিশুদের আগের ডোজের তথ্য তাদের মায়েদের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে। অনেক অভিভাবক আগের টিকার তারিখ বা ডোজের তথ্য সঠিকভাবে মনে করতে পারছেন না। ফলে কিছু শিশুর ক্ষেত্রে টিকাদানের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস পুনর্গঠন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।”
স্বাস্থ্যকর্মীরা বলছেন, শিশুদের নিয়মিত টিকাদানে প্রতিটি ডোজের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে কোনো ডোজ কখন দেওয়া হয়েছে তা নিশ্চিত না হলে পরবর্তী টিকা দেওয়ার সময় সতর্কতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
বিষয়টি আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে হামের টিকাদান কার্যক্রমের সময়। কেন্দ্রটির কর্মীরা হাম-রুবেলা টিকাদানসহ শিশুদের নিয়মিত টিকা দেওয়ার কার্যক্রম চালিয়ে আসছিলেন।
কম খরচের চিকিৎসা বন্ধ হওয়ার শঙ্কা
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারটি মিরপুরের সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য দীর্ঘদিন ধরে মাতৃ ও শিশুসেবা দিয়ে আসছে। ১৯৭৪ সালে কার্যক্রম শুরু করা প্রতিষ্ঠানটিতে শিশুদের টিকাদান, শিশুস্বাস্থ্য, প্রজননস্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন সেবা দেওয়া হতো।
হামলার পরও সেখানে টিকাদান চালু থাকায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন অভিভাবকেরা। তবে, কেন্দ্রটির স্বাভাবিক কার্যক্রম কবে ফিরবে, তা নিয়ে তাদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
৯ মাস বয়সী ছেলে আলিফ হোসেনকে নিয়ে টিকা দিতে আসা আশিক মাহমুদ বলেন, “সন্তানের জন্মের পর থেকে তার সব টিকা এই কেন্দ্র থেকেই দেওয়া হয়েছে। কম খরচে চিকিৎসা ও টিকা পাওয়ার কারণে নিম্নআয়ের অনেক পরিবার এই কেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল।”
এক বছর বয়সী সন্তানকে টিকা দিতে আসা আরেক অভিভাবক ফাইয়াজ আহমেদ বলেন, “যারা স্বাস্থ্য কেন্দ্রটি ভাঙচুর করেছে।তারা মানুষ না। কোনো সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ এ কাজ করতে পারে না। তাদের শাস্তি হওয়া প্রয়োজন।”
গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা চালানোর অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০০ থেকে ২৫০ জনের একটি দল কয়েক ঘণ্টা ধরে কেন্দ্রটিতে ভাঙচুর চালায়। দুই নিরাপত্তাকর্মীকে জিম্মি করে চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ, টিকাসহ বিভিন্ন মালামাল লুট করা হয়। পরে ভেকু দিয়ে একটি পাকা ও তিনটি আধাপাকা ভবনসহ কেন্দ্রটির বিভিন্ন অংশ গুঁড়িয়ে দেয় হামলাকারীরা। হামলার পর সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামের সাইনবোর্ড ও ব্যানার টাঙানো হয়।
এ ঘটনায় রাড্ডা কর্তৃপক্ষ শাহ আলী থানায় মামলা করেছেন। মামলায় বিএনপির ঢাকা মহানগর উত্তরের সাবেক সদস্য মোহাম্মদ হানিফ মিয়াসহ অজ্ঞাতনামা আরো ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।































