তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক: স্কুল থেকে বাচ্চাদের নিয়ে ফেরা আর কাপড় ধোয়া শেষ। যুক্তরাজ্যের ডোভার শহরের নিজের বাড়িতে কাজ শুরু করতে বসছিলেন চার সন্তানের মা ও স্টেপ-মা লিজ ম্যাককনেল। কিন্তু ঠিক তখনই গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে হঠাৎ ফায়ার অ্যালার্মের শব্দে থমকে যায় তার সকাল।
শব্দের উৎস খুঁজতে গিয়ে তিনি দেখেন, টাম্বল ড্রায়ার থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে। মেশিনটি ছুঁয়ে বুঝতে পারেন সেটি অত্যন্ত গরম, আর ভালো করে তাকিয়ে দেখেন— এর একটি অংশে আগুন লেগেছে।
ম্যাককনেল বলেন, ‘সেই মুহূর্তেই আমি ফায়ার ব্রিগেডে ফোন করি, তবে আগুনটি খুব, খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।’
তারা তাকে সঙ্গে সঙ্গে বাড়ি ছাড়তে বলেন। কেন্ট ফায়ার অ্যান্ড রেসকিউ সার্ভিস ঘণ্টার পর ঘণ্টা চেষ্টা করে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনলেও ম্যাককনেল পরিবারের বাড়িটি আংশিকভাবে ধ্বংস হয়ে যায়।
তিনি বলেন, ‘আমি যদি স্মোক অ্যালার্মের শব্দ না শুনতাম, তাহলে আমি তখনও ঘরের ভেতরেই থাকতাম। এগুলো অপরিহার্য, একেবারেই অপরিহার্য।’
স্মোক অ্যালার্ম বহু দশক ধরেই ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর প্রযুক্তিতে খুব বেশি পরিবর্তন আসেনি। প্রশ্ন উঠছে— আধুনিক জীবনযাত্রা কি ধীরে ধীরে এই জীবনরক্ষাকারী যন্ত্রগুলোর সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে?
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ই-বাইকের লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারিতে আগুন শনাক্ত করা বিশেষভাবে কঠিন। কারণ এসব আগুন হঠাৎ ও বিস্ফোরণধর্মীভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এ কারণে গবেষকেরা আগুন ও ধোঁয়া আরও দ্রুত শনাক্ত করার নতুন পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছেন। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, যেকোনও অনুমোদিত ও কার্যকর স্মোক অ্যালার্ম—কিছু না থাকার চেয়ে অনেক ভালো।
কেন্ট ফায়ার অ্যান্ড রেসকিউ সার্ভিসের কাস্টমার ও বিল্ডিং সেফটির প্রধান সুজানা অ্যাম্বারস্কি বলেন, ‘যে বাড়িতে কার্যকর স্মোক অ্যালার্ম নেই, সেখানে আগুনে মারা যাওয়ার ঝুঁকি প্রায় ১০ গুণ বেশি।’
তার সংস্থাই ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে কেন্ট অঞ্চলে প্রায় ৬,৫০০টি মেয়াদোত্তীর্ণ স্মোক অ্যালার্ম শনাক্ত করেছে।
জাতীয় পর্যায়ে, বিমা প্রতিষ্ঠান ডাইরেক্ট লাইনের গত ডিসেম্বরের এক জরিপে দেখা যায়, যুক্তরাজ্যের প্রায় ৪০ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ এমন ঘরে বাস করছেন যেখানে কোনও স্মোক অ্যালার্মই নেই। যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১৬ শতাংশ পরিবারের স্মোক অ্যালার্ম কার্যকর অবস্থায় নেই।
কীভাবে কাজ করে স্মোক অ্যালার্ম
বিল্ডিং রিসার্চ এস্টাবলিশমেন্ট (বিআরই)-এর প্রধান পরামর্শক রামন চ্যাগারের মতে, স্মোক অ্যালার্মের দুটি প্রধান প্রযুক্তি রয়েছে।
আইনাইজেশন-ভিত্তিক স্মোক অ্যালার্মে সামান্য পরিমাণ তেজস্ক্রিয় পদার্থ ব্যবহার করে বাতাসের কণাগুলোকে চার্জ করা হয়। ধোঁয়া এ প্রবাহে বাধা দিলে অ্যালার্ম বেজে ওঠে।
অন্যদিকে, অপটিক্যাল স্মোক অ্যালার্ম আলো ব্যবহার করে কাজ করে। ধীরে জ্বলা আগুন থেকে তৈরি বড় ধোঁয়ার কণা শনাক্তে এগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকর। কণাগুলো ডিভাইসের ভেতরে ঢুকলে আলো ছড়িয়ে পড়ে, যা একটি সেন্সরে ধরা পড়ে।
রান্নাঘরে সাধারণত হিট সেন্সর বসানো হয়, যাতে সামান্য ধোঁয়ায় অ্যালার্ম না বাজে। এগুলো সাধারণত তাপমাত্রা প্রায় ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়ালে সক্রিয় হয়।
যদিও স্মোক অ্যালার্ম পরীক্ষার মানদণ্ড ১৯৮০-এর দশকে তৈরি, তবুও আধুনিক নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের পরও এগুলো এখনো নির্ভরযোগ্য বলে মনে করেন চ্যাগার। তিনি বলেন, ‘আজকের দিনের বেশিরভাগ আগুনেই এগুলো সাড়া দেয়।’
চ্যাগারের নিজের বাড়িতেও একবার টাম্বল ড্রায়ারের কারণে আগুন লাগে। তিনি বলেন, ‘প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারিনি।’ পরে দেখেন, ড্রায়ারের ওপর ছাদের নিচে পাতলা ধোঁয়ার স্তর জমেছে।
সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়ায় বড় দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়। তিনি টাম্বল ড্রায়ার থাকা ঘরে স্মোক অ্যালার্ম বসানোর পরামর্শ দেন।
ই-বাইক ব্যাটারির নতুন ঝুঁকি
লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারিযুক্ত ই-বাইক নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। ইউনিভার্সিটি অব এডিনবরার ফায়ার রিসার্চ সেন্টারের সিনিয়র লেকচারার স্টিফেন ওয়েলচ বলেন, ‘ব্যাটারি নষ্ট হলে সবসময় আগুন লাগে না। অনেক সময় বিষাক্ত ও দাহ্য গ্যাস বের হয়। এগুলো জমে গেলে বিস্ফোরণের ঝুঁকি তৈরি হয়।’
চ্যাগারের গবেষণায় দেখা গেছে, এসব ব্যাটারির আগুন ভয়াবহ গতিতে ছড়ায়। তিনি বলেন, ‘হঠাৎ করে কিছুই নেই, তারপর গ্যাস বের হয়, এরপর একের পর এক বিস্ফোরণ।’
স্মার্ট ও এআই-ভিত্তিক ভবিষ্যৎ
অতি-সংবেদনশীল কিছু স্মোক ডিটেক্টর— যেমন অ্যাসপিরেটিং সিস্টেম; ক্রমাগত বাতাস টেনে নিয়ে অল্প ধোঁয়াও শনাক্ত করতে পারে। তবে এসব ব্যবস্থা ব্যয়বহুল এবং সাধারণত সার্ভার রুম বা ঐতিহাসিক ভবনে ব্যবহৃত হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে স্মোক অ্যালার্মে বড় পরিবর্তন এসেছে স্মার্ট প্রযুক্তির মাধ্যমে। ওয়াই-ফাই সংযুক্ত এসব ডিভাইস বাড়িতে না থাকলেও ফোনে নোটিফিকেশন পাঠাতে পারে।
ফায়ারঅ্যাঞ্জেলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী নিক রাটার বলেন, অপ্রয়োজনীয় অ্যালার্ম কমানো এখন শিল্পখাতের বড় দায়িত্ব। তিনি বলেন, ‘যদি মানুষ প্রযুক্তি সহ্য করতে না পারে, তাহলে সেটা আমাদের ব্যর্থতা।’
এদিকে কিড্ডে নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রে সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক ফায়ার মনিটরিং সেবা চালু করেছে, যা অ্যালার্ম বাজলে জরুরি সহায়তা ডাকার সুবিধা দেয়।
ভবিষ্যতে স্মোক অ্যালার্ম আরও ভিন্ন রূপ নিতে পারে। নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে ভিডিও ফুটেজ থেকে আগুন শনাক্তের প্রযুক্তি তৈরি করেছেন। এই প্রযুক্তি সিসিটিভি, ডোরবেল ক্যামেরা এমনকি ড্রোনেও ব্যবহার করা যাচ্ছে।
গবেষক প্রাবোধ পানিন্দ্রে জানান, এই প্রযুক্তি আগুনের আকার, গতি ও বিস্তার বিশ্লেষণ করে ভুল অ্যালার্ম কমাতে সক্ষম। ভবিষ্যতে এটি উচ্চ ভবনে আগুন শনাক্তে দমকল বাহিনীর বড় সহায়ক হতে পারে।
গবেষকরা এখন এই প্রযুক্তি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
সূত্র: বিবিসি































