দেশবার্তা ডেস্ক: দেশের জ্বালানি বাজারে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজি গ্যাস সংকটকে পুঁজি করে একের পর এক সুবিধা দেওয়া হচ্ছে আমদানিকারকদের। আমদানিসীমা বাড়িয়ে দেওয়া, ট্যাক্স কমানো এবং এলসিতে ঋণ সুবিধার ধারাবাহিকতায় ফ্রেইট চার্জও (জাহাজ ভাড়া) বাড়ানো হয়েছে গণশুনানি ছাড়াই।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে অন্তবর্তীকালীন সরকার হয় সিন্ডিকেটের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে, না হলে অদৃশ্য সিন্ডিকেট! না হলে কেনো একের পর এক ব্যবসায়ীদের চাওয়া পুরণেই বেশি মনযোগি! বাজারে দ্বিগুণ দামে বিক্রি হলেও ভোক্তা অধিদফতরসহ প্রশাসন হাত গুটিয়ে বসে রয়েছে মনে করছে ভোক্তারা।
বাড়তি দাম দিলে ঠিকই মিলছে এলপি গ্যাস, প্রায় দুই মাস ধরে চলছে এই অরাজকতা। তেমন পরিস্থিতিতে ফেব্রুয়ারি মাসে নিয়ম রক্ষার দর ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। আমদানি মূল্য সমন্বয়ের সঙ্গে এদিন জাহাজ ভাড়াও টন প্রতি ১০৮ ডলার থেকে বাড়িয়ে ১২১ ডলার করা হয়েছে। অথচ আগের জাহাজ ভাড়া নিয়েই বিতর্ক রয়েছে। প্রতিবেশি দেশ ভারতে জাহাজ ভাড়ায় অর্ধেকের কম খরচ পড়ছে।
২০২১ সালের ১২ এপ্রিলে প্রথমবারের মতো এলপি গ্যাসের দর ঘোষণা করা হয়। তখন বলা হয়েছিল এখন থেকে সৌদির দর উঠা-নামা করলে ভিত্তিমূল্য উঠানামা করবে। অন্যান্য কমিশন, জাহাজ ভাড়া, আমদানিকারকের কমিশন, ডিলার এবং খুচরা বিক্রেতার কমিশন কমবেশি করতে হলে নতুন করে গণশুনানি করা হবে। ওই ঘোষণার পর থেকে প্রতিমাসে এলপিজির দর ঘোষণা করে আসছে বিইআরসি।
গণশুনানি ছাড়াই জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি প্রসঙ্গে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেছেন, জাহাজ ভাড়া কমবেশি হয়ে থাকে, আমরা আগেও সমন্বয় করেছি। এনবিআর থেকে তথ্য নিয়ে দেখা গেছে দাম কিছুটা বেড়েছে, যে কারণে সমন্বয় করা হয়েছে। এখানে আইনের কোন বত্যয় করা হয়নি।
শুধু এসব সুবিধা নয়, আমদানিকারকদের দাবীর প্রেক্ষিতে ঋণে এলসি খোলার অনুমতি প্রদান করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে গত ১২ জানুয়ারি জারি করা আদেশে ২৭০ দিন পর্যন্ত বাকীতে এলপিজি আমদানির সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে সংকটের কথা বলে ৫টি কোম্পানি তাদের আমদানির ঊর্দ্ধসীমা সংক্ষিপ্ত বাড়িয়ে নিয়ে গেছেন। যুমনা স্পেসটেক এলপি গ্যাসের ১ লাখ ৮০ হাজার টন আমদানির উর্ধসীমা বাড়িয়ে ৬ লাখ ৫০ হাজার টন করা হয়েছে। একইভাবে ডেল্টা এলপিজির ২০ হাজার টন বাড়িয়ে ৮০ হাজার টন, ওমেরা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের বার্ষিক আমদানির ক্ষমতা ৩ লাখ টন থেকে বাড়িয়ে ৫ লাখ টন, মেঘনা এলপিজির ২ লাখ ৫০ হাজার টন থেকে বাড়িয়ে ৪ লাখ ৬০ হাজার টন, ইউনাইটেড গ্রুপের আইগ্যাসকে ১ লাখ টন থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ টন আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
এতো কিছুর পরও বাগে আনা যাচ্ছে না এলপি গ্যাসের দাম। বিইআরসি ১২ কেজি এলপিজির দাম ১৩৫৬ টাকা নির্ধারণ করলেও বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১৮’শ থেকে ২২’শ টাকায়। প্রকাশ্য বেশি দামে বিক্রি করা হলেও ভোক্তা অধিদপ্তর হাত গুটিয়ে বসে রয়েছে। চলছে দায় চাপানোর খেলা।
যুমনা স্পেসটেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বেলায়েত হোসেন এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, অনেকে আমদানিকারকের কারসাজি অভিযোগ করেন, কেউ কোন কারসাজি করছে বলে আমার মনে হয় না। সমস্যা হচ্ছে ডিলার সাবডিলার পর্যায়ে। অনেকে আমদানি করতে পারেনি, তাই বাজারে সংকট তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা দাবি করছে, নির্ধারিত দামে মিলছে না, তাই বাড়তি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। একাধিক ডিলার দাবি করেছে খোদ আমদানিকারক বেশি দাম নিচ্ছেন। তবে ভাউচারে কম দাম দেখানো হচ্ছে, সরকার আন্তরিক হলে এই জালিয়াতি ধরে ফেলা সম্ভব। কোন একটি কোম্পানির ব্যাংক হিসাব যাচাই করলেই প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেছেন, পকেট ভরার জন্য সিলিন্ডার খালি দেখানো হচ্ছে। তা না হলে বেশি দাম দিলে গ্যাস কেমনে পাওয়া যায়!
জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি প্রসঙ্গে ক্যাবের জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা ড. শামসুল আলম বলেছেন, বিইআরসি ভোক্তাদের স্বার্থ সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়েছে। তারা ধারাবাহিকভাবে অনিয়ম করে চলেছে। এর আগেও তারা গণশুনানি ছাড়া সরকারি এলপি গ্যাসের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। আমরা কোর্টে যাচ্ছি সেখানেই জবাব আদায় করা হবে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেছেন, এলপিজির এই সংকট থেকে যেনো আমরা শিক্ষা নেই, ভবিষ্যতে যেনো এমন সংকট না হয়। গত নভেম্বর-ডিসেম্বরে অসংখ্য জাহাজ কালো তালিকাভূক্ত করা হয়েছে। নভেম্বরের ১৮ তারিখে ২০ হাজার টন এলপিজি নিয়ে একটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরের কাছাকাছি এসে ফিরে গিয়েছে। নভেম্বরে ওই জাহাজ যোগ হলে ১ লাখ ২৫ হাজার টন আমদানি হতো।
এলপিজি সরবরাহে সংকট রয়েছে, যারা আমদানি করছে, যারা আমদানি করছেন না তাদের সবার সঙ্গে কথা বলেছি। তারা যেনো আমদানির সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন, যেনো বেশি আনা যায়। ১ লাখ ৫০ হাজার টন আমদানি নিশ্চিত করা গেলে, আশা করি সংকট থাকবে না বলে জানান তিনি।
শুধু ব্যবসায়ীদের স্বার্থ দেখা হচ্ছে, বেশি দামে বিক্রি হলেও কোন ব্যবস্থা না নেওয়া প্রসঙ্গে বিইআরসি চেয়ারম্যান বলেন, বাজারে এলপিজির ঘাটতি রয়েছে, এ অবস্থায় বেশি চাপ দিলে হিতের-বিপরীত হতে পারে! যে কারণে সরবরাহ বাড়াতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আশা করছি শিগগিরই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে।































