নিউজ ডেস্ক: টেংরাটিলা গ্যাস ফিল্ডে বিস্ফোরণের দায়ে কানাডিয়ান কোম্পানি নাইকো রিসোর্সের ৪২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার জরিমানা করা হয়েছে। ওই অর্থ বাংলাদেশকে প্রদানের নির্দেশনা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর সেটেলমেন্ট অব ইনভেস্টমেন্ট ডিসপিউট (ইকসিড) ট্রাইব্যুনাল।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজানুর রহমান ইকসিডের রায়ের বিষয় নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেছেন, সম্ভবত ৪২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বাংলাদেশ দিতে বলা হয়েছে।
পেট্রোবাংলার একটি সূত্র জানিয়েছে, ৮ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস নষ্টের দায় বাবদ ৪০ মিলিয়ন ডলার এবং পরিবেশসহ অন্যান্য ক্ষতিসাধনের জন্য ২ মিলিয়ন ডলার মিলে প্রায় ৪২ মিলিয়ন ডলার (৫১৬ কোটি টাকা, ১ ডলার ১২৩ টাকা) ক্ষতিপূরণ দিতে বলা হয়েছে।
ট্রাইব্যুনালে গ্যাসের ক্ষতি বাবদ ১১৮ মিলিয়ন এবং রাষ্ট্রের ক্ষতি বাবদ ৮৯৬ মিলিয়ন ডলারের একটি হিসাব দিয়েছিল বাংলাদেশ। এর সঙ্গে এখন পরিবেশগত ক্ষতি ও স্বাস্থ্যগত ক্ষতির হিসাব যোগের আবেদন ছিল। নাইকো কর্তৃক অনুসন্ধান কূপ খনন কালে ২০০৫ সালের ৭ জানুয়ারি ও ২৪ জুন দুই দফা মারাত্মক বিস্ফোরণ ঘটে। বিষয়টি বাংলাদেশে আদালত ধরে ইকসিডে গড়ালে ২০২০ সালে নাইকোকে দায়ী করা হয়। সেই প্রেক্ষিতে গতমাসে ওই আদেশ দিয়েছে ইকসিড।
ওই গ্যাস ফিল্ডে বিষ্ফোরণের কারণে মজুদ গ্যাস পুড়ে যায়। আশপাশের সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এজন্য নাইকোর কাছে ৭৪৬ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করলে অস্বীকৃতি জানায় নাইকো। এ কারণে ২০০৭ সালে স্থানীয় নিম্ন আদালতে মামলা দায়ের এবং নাইকোর ফেনী ফিল্ডের গ্যাসের বিল প্রদান বন্ধ করে দেয় পেট্রোবাংলা। হাইকোর্ট বাংলাদেশে থাকা নাইকোর সকল সম্পদ বাজেয়াপ্ত ও সম্পাদিত চুক্তি বাতিলের আদেশ দেয়। এরপর সুপ্রিম কোর্টে যায় নাইকো, সেখানেও বাংলাদেশের পক্ষে রায় হয়। আটকে রাখা গ্যাস বিল এবং ক্ষতিপূরণ না দেওয়ার জন্য ২০১০ সালে ইকসিডে দুটি মামলা করে নাইকো। ২০১৪ সালে এক রায়ে ইকসিড পেট্রোবাংলাকে ফেনী গ্যাসক্ষেত্রের পাওনা পরিশোধ করতে বলে।
ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি ফিল্ডটির অবশিষ্ট মজুদ গ্যাস উত্তোলন বাংলাদেশের জন্য খুবই জরুরি। প্রতিদিনেই কমতে থাকা গ্যাস উৎপাদনে অনেকটা স্বস্তি এনে দিতে সক্ষম ফিল্ডটি। জামালপুর ও কিংবা জকিগঞ্জের মতো নতুন কোন ফিল্ডে গ্যাস পেলেও সিস্টেমে যোগ করা সময় সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল। সেখানে ছাতকে পাইপলাইন বিদ্যমান, গ্যাস তুলে দ্রুত সরবরাহ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। আর প্রমাণিত মজুদও অনেক থাকায় ফিল্ডটি এই সময়ে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিবেচিত হতে পারে।
১৯৫৯ সালে আবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্রটিতে পরের বছর কূপ খনন করে ১০৯০ মিটার থেকে ১৯৭৫ মিটারের মধ্যে নয়টি গ্যাস স্তর আবিষ্কার করা হয়। গ্যাস উত্তোলন করে ছাতক সিমেন্ট ও পেপার মিলে সরবরাহ করা হতো। ২৬ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করার পর পানি আসতে শুরু করায় কূপটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।কিছুদিন বন্ধ থাকার পর ২০০৩ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি গ্যাসক্ষেত্রটি কানাডিয়ান কোম্পানির নাইকোর হাতে তুলে দেওয়া হয়। নাইকো কর্তৃক অনুসন্ধান কূপ খননকালে মারাত্মক বিস্ফোরণ ঘটে।
সম্ভাবনাময় গ্যাসফিল্ডটি ফাটল থাকায় ছাতক পূর্ব ও ছাতক পশ্চিম (টেংরাটিলা) নামে বিভক্ত। অগ্নিকাণ্ডে ছাতক পশ্চিমের একটি স্তুরের গ্যাস পুড়ে যায়, অন্যান্য স্তর এবং ছাতক পূর্বের মজুদ অক্ষত রয়েছে। সম্ভাব্য মজুদ ২ থেকে ৫ টিসিএফ (ট্রিলিয়ন ঘনফুট) বিবেচনা করা হয়। সেখানে গ্যাস পাওয়া গেলে দ্রুত সময়ের মধ্যে সরবরাহ করা সম্ভব।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজানুর রহমান বলেছেন, ছাতক ফিল্ডে কূপ খননের জন্য ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) প্রস্তুত রয়েছে। আমরা ইকসিডের রায়ের অপেক্ষায় ছিলাম। এখন আইনজীবীর মতামত নিয়ে দ্রুত পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
দেশীয় গ্যাস ফিল্ডগুলোর মজুদ ফুরিয়ে আসছে, এতে প্রতিনিয়ত কমে যাচ্ছে উৎপাদন। এক সময় দেশীয় গ্যাস ফিল্ডগুলো থেকে দৈনিক ২৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেতো এখন ১৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমেছে। প্রতি দিনেই এক থেকে দুই মিলিয়ন উৎপাদন কমছে এক বিবিয়ানা গ্যাস ফিল্ডেই। যে কোন সময়ে উৎপাদনে বড় ধরণের ধ্বসের শঙ্কা দেখছেন অনেকেই। সেই ঘাটতি সামাল দেওয়ার মতো উপযুক্ত বিকল্প নেই পেট্রোবাংলার হাতে। দেশের চাহিদা ও সরবরাহের ঘাটতির মোকাবিলায় এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে। বিদ্যমান দু’টি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের সর্বোচ্চ সক্ষমতা (১১০০ মিলিয়ন) ব্যবহার করা হচ্ছে। চাইলেও আর বাড়ানোর কোন সুযোগ নেই।
নাইকো আরেকটি কারণে বিশ্বব্যাপী ব্যাপক সমালোচিত হয়। কানাডার আদালতে নাইকোর বিরুদ্ধে মামলা করেছিল সে দেশের সরকার। অপরাধ ছিল কাজ পাওয়ার জন্য বাংলাদেশের রাজনীতিক ও কর্মকর্তাদের ঘুষ দিয়ে কানাডার ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করা হয়েছে। নাইকো আদালতে দোষ স্বীকার করে লঘু শাস্তি ১০ লাখ ডলার জরিমানা দিয়ে রক্ষা পান।































